x 
Empty Product

রাজশাহী শহরের একেবারে পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পদ্মা নদী।আর এই পদ্মা নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে রাজশাহী শহর।রাজশাহী শহরের আর,ডি,এ মার্কেটের দক্ষিনে পদ্মার তীর ঘেঁসে রয়েছে বিশাল এক বহু পুরাতন ভবন।এই বিশাল ভবনের নাম বড়কুঠি।এই বড়কুঠি আজ থেকে কত বছর আগে তৈরী হয়েছিল,তা কেউ ঠিক মত বলতে পারে না।কেউ বলেন ৩০০ বছর,আবার কেউ বলেন ৪৫০ বছর আগে তৈরী।এই ভবনকে ঘিরে একটা মহল্লা গড়ে উঠেছে।নাম বড়কুঠিপাড়া।ইতিহাস বলে এটা নাকি পর্তুগিজরা তৈরী করেছিল।শেষের দিকে নীলকর ইংরেজরা থাকত।এই বড়কুঠিতেই বাংলার কৃষকদের ওপর নীলকর ইংরেজরা চালাত অমানুষিক নির্যাতন।এখানকার মুরুব্বীরা বলেন,আজও নাকি গভীর রাতে সেই অমানুষিক নির্যাতনের করুণ আর্তনাদ শোনা যায়।ছোটবেলায় এই বড়কুঠির সামনে দেখেছি নীলকর ইংরেজ সাহেবদের চিকন টালি ইটের তৈরী ঘোড়ার আস্তাবল।এখন অবশ্য সেই ঐতিহাসিক ঘোড়ার আস্তাবলটা নাই।এখন ওখানে রাজশাহী ল কলেজ হয়েছে।যাইহোক,আসল কথাই আসি।এই দোতলা ভবনটার পূর্ব ও পশ্চিম দিকে রয়েছে দুটো ঘোরানো সিঁড়িঁ।এই সিঁড়িঁ দুটো ভবনটার মাটির নীচে চলে গেছে।আর মাটির নীচে রয়েছে এক বিশাল বড় রুম।এই মাটির নীচের রুমের ভিতর দিয়ে পদ্মা নদীর তলা দিয়ে ছিল এক বিশাল বড় একটা রাস্তা।এই রাস্তা দিয়ে নাকি একসাথে ১০টা ঘোড়া দৌড়াতে পারতো।আর এ পথটার শেষ মাথা ছিল বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলার রাজবাড়ী পর্যন্ত।এখন অবশ্য কতৃপক্ষ সিঁড়িঁ দুটোর নীচের দিকে অর্ধেক প্রাচীর দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে রেখেছে।আমার জানা মতে এরকমের ঐতিহাসিক রাস্তা এ অঙ্চলে আর নাই।আমার মতে এই বড়কুঠির সঠিকভাবে প্রচার করলে অনেক পর্যটক আসবে।দেশে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে।

Friday, 23 August 2013 14:20

আম নিয়ে প্রতারণা

Written by

মৌসুমি ফল আম নিয়ে চলছে নানা প্রতারণা। বাজার ছেয়ে গেছে রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত আমে। পাশাপাশি নগরীর কয়েকটি পয়েন্টে রাসায়নিকমুক্ত আমও বিক্রি হচ্ছে। তবে এসব আমের দাম একটু বেশি। চেনার উপায় না থাকলেও আম কিনতে সচেতন হতে বললেন ব্যবসায়ীরা। সৌন্দর্য না দেখে গুণগত মান বুঝে আম কেনার পরামর্শ দিয়েছেন বিক্রেতারা।
 ব্যবসায়ীরা জানান, রাসায়নিক দ্রব্য 'কার্বাইড' দিয়ে আম পাকানো হচ্ছে। এছাড়া আমের পচন রোধে ব্যবহার হচ্ছে 'ফরমালিন'। এসব মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হলেও এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী আমসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলে দেদারচে মেশাচ্ছে 'কার্বাইড' ও 'ফরমালিন'। ভ্রাম্যমাণ আদালতও ফলের আড়তগুলোতে অভিযান চালিয়ে কোনো প্রতিকার করতে পারছে না।
 চট্টগ্রামের প্রধান ফলের আড়ত রেলওয়ে মেনস্ সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী শফিউল আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলা থেকে আসছে আম। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মেহেরপুর, চুয়াডাঙা ও কুষ্টিয়া থেকে আসবে। একই সময়ে পাওয়া যাবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। তবে রাজশাহীর ফজলী আম চট্টগ্রামের বাজারে আসতে আরো এক মাস সময় লাগবে।'
 আড়ত সূত্র জানায়, এখন বাজারে গোবিন্দভোগ, হিমসাগর, মল্লিকা ও আম্রপালি আম বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আগামী মাসের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের কানসাট, মির্জাপুর এলাকা থেকে আম আসবে। বাজারে দেশি আমের পাশাপাশি আমদানি করা প্রচুর আমও রয়েছে। আমদানি করা আমে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
 রাসায়নিক মিশ্রিত আম প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ হাসিনা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত যেকোনো ফল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কার্বাইড দিয়ে পাকানো আম খেলে কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'
 এদিকে মেরিডিয়ান ও ইস্পাহানী গ্রুপ তাদের নিজস্ব বাগান থেকে প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন জাতের দেশি আম বাজারজাত করছে। এসব আম রাসায়নিক মিশ্রণমুক্ত। এছাড়া নগরীর কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মির্জাপুর ও নওগাঁ জেলার নিজস্ব বাগান থেকে সরাসরি আম নিয়ে আসছেন চট্টগ্রামে। তারা নগরীর জিইসি মোড়, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, হালিশহর এলাকায় অস্থায়ী স্টলে বিক্রি করছে রাসায়নিক মিশ্রণমুক্ত আম।
 এ প্রসঙ্গে এস কে এগ্রো প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ফরহাদ উদ্দিন সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে নিজস্ব আমের বাগান থেকে সরাসারি আম নিয়ে আসছি। রাসায়নিক মিশ্রন মুক্ত পণ্যের নিশ্চয়তা দিয়ে আমরা আম বিক্রি করছি। কারণ বাগান থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আম নিয়ে আসায় আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে পারছি। এক্ষেত্রে দামটা একটু বেশি।'

চির সোহাগী আমের একটুও ধকল সয় না। প্রকৃতির সঙ্গে তাকে অনেক লড়াই করতে হয়। ভ্রূণকালে তাকে শেষ করতে চায় কুয়াশা, শিলাবৃষ্টি, প্রচণ্ড খরা। এদের একের পর এক উপদ্রবে আমের মুকুল বা গুটিগুলো অসময়ে ঝরে যায়। এই ঝরে পড়ে বলেই আমের আরেক নাম 'চূত'। আম ছাড়া অন্য কোনো মুকুল বা কচি ফলের জীবন কুয়াশায় মরে যায় না। এখন আর একটি যোগ হয়েছে- ইটের ভাটির ধোঁয়া। ফল পাকার সময় গরম তার ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু মাঘ-ফাল্গুন মাসে গাছের গোড়ায় সার ও পানি দিতে হয় বৃষ্টি না হলে। ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা বোঁটায় একটি-দুটি বা তিনটি আম যখন হাওয়ায় দুলতে থাকে তখন কী দেমাগ তার! দোলনায় গান গেয়ে দোল খাওয়ার মতো রূপের বাহার দেখায় উসকানি দিয়ে। ডাকে, 'এসো আমার ঘরে।'
 ২২শে জুনের শিবগঞ্জের সুসিদ্ধ গরমে আম শ্রমিকরা সাইকেলের দুই পাশে দুটি বড় ঝুড়িতে আম নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
 হাঁটার তালে তাল কাটলে ভারসাম্য টলমলে। রিকশা ভ্যানেও আম। ট্রাকে আম। মাথায়, কাঁধে আম অথবা খড়ের আঁটি। রাস্তা জমে যাচ্ছে। আবার জট খুলছে। মাথার ওপর গ্রহপতি সূর্যের রোদসোনা দীপক রাগে গান গাইছে। কিন্তু আমের রসের স্বাদের কাছে সূর্য তুচ্ছ। এতক্ষণ রাস্তার দুই পাশে দেখেছি বাগান। ঝুলে আছে ফলের রাজপুত্তুর। পাকা, আধাপাকা, কাঁচা। বাগানে ঢুকে যত দূর চোখ যায় আমগাছের মোটা গোড়া। কোনো কোনোটি এক শ বছুরে, কিন্তু দুর্দান্ত যুবক। না, না, এরা এই পৃথিবীর প্রথম সন্তান গাছপালার বংশধর।
 কালের কণ্ঠের ব্যুরোপ্রধান রফিকুল ইসলামকে বলে গাড়ি থামিয়ে নেমেছি। সঙ্গে আছে কালের কণ্ঠের ফটোশিকারি সালাহউদ্দীন। আম ঝুলে আছে নাকের ডগায়। সুযোগ পেয়ে মাথার চুলে আদর-থাপড় দিতে কসুর করছে না। ওটা সোহাগীর আদর-চুমো ভাবতে দোষ কী! ও সোহাগী আম, আমি পাগল হয়ে যাব। দূর থেকে তোমার সুগন্ধ পাই। তোমার পাকা রসের ধারা মত্ততা আনে। দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াকে বলা হয়েছে 'সোমধারা', অর্থাৎ অমৃত প্রসবকারী। এই সোমধারার শক্তি বল দেয়, শুক্রবহ স্রোতকে শুদ্ধ করে। এসব ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের কথা। ওতে বলা আছে, রাতে ফল খেতে নেই। বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি কম, তখন বেশি খেলে উপকারের চেয়ে অপকারই বাড়বে। গাছ থেকে পাকা আম পেড়ে তিন-চার দিন বা আরো বেশি দিন রেখে চামড়া একটু কুঁচকে গেলে তখনই আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। অমৃততুল্য ও উপকারীও। আমাদের কি অত তর সয়? অপেক্ষা না করলে কি প্রকৃত সুখসম্ভোগ হয়?
 এবারের সফরসঙ্গী যুবায়ের হাসান, রফিকুল ও সালাহউদ্দীন সকালের নাশতা করেনি। ব্যস, বসে গেলাম শিবগঞ্জের ব্যস্ততম রেস্তোরাঁয়। যুবায়ের ও আমি শুধু চা। কিন্তু শিবগঞ্জের চমচম খাব না, সেই বান্দা আমি নই। রফিকরা একটার পর একটা বলছে, আমিও টপাটপ খাচ্ছি। আম তো হোটেলে খাওয়া যায় না, বাজারের আম অন্তত আট-দশ দিন পর খাওয়ার যোগ্য হবে। সকালের আমের হাট মানে লোকারণ্য। একটু পর রাস্তার অদূরে বাঁয়ে বিখ্যাত কানসাট বাজার। রাস্তার এক পাশে আমের গাড়ির শোভাযাত্রা। মিষ্টি ও চা খেয়ে আবার গাড়িতে। বাজারে এখনো ফজলি তেমন নেই। রফিক আমের বিক্রেতা থেকে দর জেনে নিচ্ছে গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে। গুটি আমের মণ ১৪০০ টাকা, ল্যাংড়া ১৮০০-২২০০, ক্ষীরসা (যাকে হিমসাগর বলে) ২২০০-২৪০০, দিলশাদ ১২০০-১৬০০, ফজলি ১২০০-১৪০০ টাকা।
 আশ্বিনা আম এখন গাছে দুলে দুলে বড় হচ্ছে। ল্যাংড়া বড়জোর আর ১০ দিন থাকবে। বাগান থেকে কাঁচা, আধাপাকা তুলে সারা দেশে চলে যাবে। বেশি পাকা বা পাকা আম খাঁচায় ভরে দূর-দূরান্তে নেওয়া যায় না। অত্যাধুনিক হিমাগার থাকলে পাকা ও সুপুষ্ট আম খেতে পেতাম। আজ পর্যন্ত দেশে আমের একটি হিমাগারও হয়নি। রফিক বলে, এখানকার আম ব্যবসায়ী ধনীরা নগদ টাকা জমিয়ে রাখার পক্ষপাতী। অন্য কোনো ব্যবসাতে খাটাতে চায় না। এ জন্য রাজশাহী, চাঁপাইয়ে তেমন করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। ব্যবসায়ীদের কোমরেই থাকে ৫০-৬০ হাজার টাকা। ওতেই যেন সুখ। দিনের শেষে হয়তো ব্যাংকে জমা দেবে।
 এখানে আমে ফরমালিন মেশানো হয় না। আড়তেও হয় না। কারণ আম বাজারে আসে শক্ত থাকতে। তাই ফরমালিন দিয়ে টাকা খরচ করতে হয় না। আমের রং সুন্দর করার জন্য কার্বাইডও এখানে মেশানো হয় না। গাছ থেকে পেড়ে এক দিনেই আম চলে আসে আড়তে। দু-এক দিনেই ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। বাজারে খালি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, আম ভর্তি হচ্ছে, আরো আসছে। মফস্বল শহরে ও রাজধানীতে ক্রেতাদের লুব্ধ করতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কার্বাইড, ফরমালিন ইত্যাদি নানা ওষুধ মেশায়। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় বলবে লোকবল, আইন ও আইন প্রয়োগকারীর দোষ। এর ঘাড়ে ও, ওর ঘাড়ে সে দোষ চাপাবে। চাপান-উতোর এভাবে চলছেই।
 আমরা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি বা সিলেটে বসে খাই কাঁচা আম। কিলিয়ে পাকা কাঁঠালের মতো অনেকটা। আগে দুবার আম দেখতে ও খেতে এসে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব সত্য শুনেছি। রফিকও বলেছে। আমচাষিরও একই কথা। বলে, 'আমরা কেন ওষুধ মিশিয়ে খামোকা টাকা নষ্ট করব? আমাদের কাঁচা আমই তো বেচা হয়ে যাচ্ছে। গাছ থেকে পেড়ে এক রাতও রাখতে হয় না। আর দু-এক রাতে আমাদের আম নষ্ট হবে কেন? ওসব আপনাদের ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাজ। আপনারাও দেখতে সুন্দর না হলে কেনেন না।' আর সত্যিই, আম তো এমনিতেই সুন্দরী। ওকে স্নো-পাউডার মাখাতে হয় না। ওসব মানুষ মেয়েদের জন্য। সোহাগী আমের শ্যামলী রূপ একান্তই বাংলার। মাঝে মাঝে হলুদ ওড়না, রঙিন শাড়ি গায়ে। কপালে লাল টিপ কখনো।
 রাজশাহী ও চাঁপাইয়ের আমবাগানে আমার বয়সী ও আমার চেয়ে বেশি বয়সী গাছদের দেখে আমি খুশি। সারা দেশে আমার বয়সী গাছ খুব কম। এমনকি বটগাছও দেখা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্যেও খুব কম দেখেছি। এখানে এসে আমার চেয়ে বয়স্ক গাছ দেখে আমি শ্রদ্ধা জানাবার সুযোগ পাই। 'আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।/সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে' গানটি গাওয়ার সাহস পাই। এ জন্য প্রখর গ্রীষ্মে আসা। নয়তো পাগল হয়ে যাব।

নিজের হাতে আমটা নিলেন হাজি সাহেব। একটা ছুরি দিয়ে নিখুঁতভাবে ছাড়ালেন সবুজ খোসা। বেরিয়ে এলো কমলা রঙের পয়লা স্তর। আগ্রহী কয়েকজন জানতে চাইলেন, এ আমের বৈশিষ্ট্য কী? কোনো উত্তর না দিয়ে ছুরি ঢোকালেন আমের গভীরে। খানিকটা কেটে দেখিয়ে দিলেন হলুদ খোসা। এটাই হচ্ছে আমের দ্বিতীয় খোসা। চোখ কপালে তুলে ফেলল একজন, 'তাহলে একটা আমে দুই খোসা!'
 সত্যি তা-ই। দুই খোসার এই আমের নাম আনারকলি। খানিকটা কেটে একজনের হাতে দিলেন। মুখে দিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বললেন, 'আরে! এটা তো চোষা আর লখনভি দশারির মিলিত স্বাদ।'
 গোপন কথাটা তখনই ফাঁস করলেন হাজি সাহেব, 'হুঁ। দুটি প্রজাতির সংকর করেই আনারকলির জন্ম।' দুই খোসার এই আমের উদ্ভাবক হাজি কলিমুল্লাহ খান।
 ভারতের উত্তর প্রদেশের মালিহাবাদ। জায়গাটা লখনৌ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। এখানে রয়েছে অনেক আমবাগান। এমনই এক বাগানের গাছে ঝুলছে শচীন টেন্ডুলকার, ঐশ্বরিয়া রাই প্রমুখ নামের নতুন নতুন আম। বাগানটির মালিক ৭৩ বছর বয়সী আমচাষি হাজি কলিমুল্লাহ খান।
 কিশোর বয়স থেকেই আমের প্রতি কৌতূহল। তাঁর পূর্বপুরুষের প্রায় দেড় শ বছরের আমচাষের ঐতিহ্য। কিন্তু তাঁদের মতো গতানুগতিক আম উৎপাদনে জীবনটা পার করতে চাননি কলিমুল্লাহ খান। সে কারণেই শুরু করলেন নিত্যনতুন আমের জাত উদ্ভাবন। কাজের জন্য বেছে নিলেন শতবর্ষী একটি আমগাছ। ওই গাছে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে ফলালেন ৩০০ প্রজাতির আম! প্রতিটি প্রজাতির আম আকার, আয়তন আর বর্ণে আলাদা। পাতলা টিনের নেমপ্লেটে নাম খোদাই করে প্রতিটি প্রজাতির পাশে লাগিয়েও দিয়েছেন। কলিমুল্লাহ খান বলেন, 'এই গাছটিই আমার হৃদয়। বেছে বেছে এই গাছে সেরা জাতের আম ফলিয়েছি।' গাছটি এতই বড় যে মনে হয়, একটা ফলবাগান। ৩০০ প্রজাতির আম ফলানো বাগানের খোঁজ পাওয়া যেখানে দুষ্কর, সেখানে একই গাছে ৩০০ জাতের আম- ফলবাগানের চেয়ে কম কী? নতুন জাতের আমের নামকরণও করতে লাগলেন বিখ্যাতদের নামে। শচীন টেন্ডুলকারের নামের আমটি উদ্ভাবন করেছিলেন ২০১০ সালে। চোষাসহ ভারতের সবচেয়ে ভালো দুই ধরনের আমের সমন্বয়ে উদ্ভাবিত আম মাখন ও মিষ্টি স্বাদের 'শচীন আম'।
 তাঁর উদ্ভাবিত 'ঐশ্বরিয়া' দেখতে খুবই সুন্দর। কলিমুল্লাহ খানের মতে, "দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরীর মতো 'ঐশ্বরিয়া আম'ও দেখতে খুব সুন্দর।" চলচ্চিত্রজগতের আরো কয়েকজন তারকার নামেও উদ্ভাবন করেছেন আম- আনারকলি, নয়নতারা, নার্গিস, জাহানারা। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও উত্তর প্রদেশের গভর্নর টি ভি রাজেশ্বরের নামেও রয়েছে আম।
 ভারতের যে অঞ্চলে যে আম বিখ্যাত, সেখান থেকে জোগাড় করেছেন সেই জাতের চারা। উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল থেকে ল্যাংড়া, পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিমসাগর, মহারাষ্ট্র থেকে আলফনসো। সেরা জাতের এসব আমের সম্মিলনই ঘটেছে তাঁর বাগানে।
 নেই উদ্যানবিদ্যা বা কৃষিবিদ্যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। লেখাপড়াও করতে পারেননি বেশিদূর। আম নিয়ে এই উদ্ভাবনী দক্ষতা তাঁর কাছে 'গড গিফটেড'। এই বয়সেও হাজির হচ্ছেন ভারতের নানা স্থানে অনুষ্ঠিত আম উৎসবে। সঞ্চয় করছেন অভিজ্ঞতা। ফলটি সম্পর্কে বাড়িয়ে নিচ্ছেন জ্ঞান। অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন নিজের জ্ঞানটুকু। গন্ধ শুঁকে আর একবার মাত্র দেখেই শনাক্ত করতে পারেন যেকোনো আমের জাত।
 কলিমুল্লাহ খানের ফলবাগানের নাম 'আবদুল্লাহ নার্সারি'। বাগানটি মালিহাবাদ রেলস্টেশনের কাছেই। ১৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বাগানের আম ভারতের বিভিন্ন জায়গাসহ রপ্তানি করা হয় বিশ্বের নানা দেশে। নানা জাতের আম উদ্ভাবনের জন্য ২০০৮ সালে পেয়েছেন ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান- পদ্মশ্রী। ইরানে স্থায়ী অভিবাসী হওয়ার আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছেন কেবল আমের জন্যই। আমই তাঁর 'অক্সিজেন'।
 দিল্লির গণধর্ষণের শিকার সেই আলোচিত শিক্ষার্থীর নামে এ বছর কলিমুল্লাহ খান উদ্ভাবন করেছেন নতুন জাতের আম 'নির্ভয়া'। কেন এই নাম রাখলেন? 'সাহসী মেয়েটা যেভাবে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেছিল, তা সব সময় মনে রাখার মতো। তাকে মনে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে আমের সঙ্গে তার নামটি জুড়ে দেওয়া।' বললেন কলিমুল্লাহ খান।
 তিন বছর আগে নিজের আমবাগানে 'নির্ভয়া'র গাছ লাগিয়েছিলেন। তাঁকে অবাক করে এ বছরই প্রথম ফল এসেছে। প্রথম ফলন হিসেবে এ বছর আমের আকার ছোট হলেও আশা করছেন আগামী বছর থেকে 'নির্ভয়া' সঠিক আকার পাবে। শুধু আম নয়, একটি গাছে ৫৪ রকম ফুল ফলিয়েও চমক দেখিয়েছেন কলিমুল্লাহ খান। ১৯৯৯ সালে এমনই এক ফুলের গাছ উপহার দিয়েছিলেন তখনকার প্রেসিডেন্ট কে আর নারায়ণনকে। দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের মোগল গার্ডেনে এখনো আছে গাছটি।

আমের নাম যদি হয় বউভুলানি, রানীপছন্দ বা জামাইখুশি তাহলে বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়, এগুলোর স্বাদ-গন্ধ কেমন। ধারণা করা যেতেই পারে, হিমসাগর, ল্যাংড়া বা ফজলির চেয়ে এগুলোও কোনো অংশে কম নয়। ক্ষেত্রবিশেষে এক কাঠি সরেস। এ তো গেল দেশি ফলের কথা। আমেরিকার হানি ডিউ বা পালমার, জাপানের সূর্যডিম, থাইল্যান্ডের মহাচনক- এ রকম আরো কত আম। ছোট ছোট গাছে লম্বা বোঁটায় সারি সারি ঝুলছে। নয়ন সুখকর এমন দৃশ্য দেখে জিহ্বায় জল এসে যায়।
 কেবল আমই নয়; জাম্বুরা, সজনে, কুমড়া বা ঘরসজ্জার বাহারি ক্যাকটাস, ফুল-ফল, ঔষধি ও অর্নামেন্টাল গাছ- কী নেই হরেক গাছের মিলনমেলায়? মেলাটি বসেছে রাজধানীর শেরে বাংলানগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশের ফাঁকা জায়গায়।
 বৃক্ষমেলায় প্রবেশ করলেই চারদিকে কেবলই সবুজের সমারোহ। চোখ জুড়িয়ে যায়। বৈশিষ্ট্যগুণে নগরবাসীর দৃষ্টিও কেড়েছে যথেষ্ট। প্রতিদিন হাজারো বৃক্ষপ্রেমী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় করছেন মেলায়। ঘুরেফিরে কিনে নিচ্ছেন পছন্দের গাছ। আমলকি বা চালতা, বিলেতি আমড়া বা বনসাই- যার যেটা পছন্দ।
 জাতীয় বৃক্ষমেলা ২০১৩ ৫ জুন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলবে ৫ জুলাই পর্যন্ত। দেশি-বিদেশি কয়েক হাজার গাছের ঠাঁই হয়েছে মেলায়। কোনোটা ঔষধি, কোনোটা ফলদ আবার কোনোটা বনজ। তবে মেলায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে নানা জাতের আমের গাছ। পাকা লাল-হলুদ বাহারি রঙ আর ঢঙের আমগুলো ঝুলছে টবের গাছে গাছে।
 নজর কাড়ছে ফল সুশোভিত আমেরিকান পালমার আম গাছ। পাকার আগেই আমের উপরের অংশে লাল রঙ ধারণ করেছে। পাকলে হয়ে উঠছে রক্তাক্ত লাল। একেকটি আম ওজনে প্রায় ৫০০ গ্রাম। বেশ কয়েকটি স্টলেই দেখা মিলল পালমার আমের। খেতে অতি মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত।
 জাপানি জাতের সূর্যডিম আম আকারে ডিমের মতোই। পাকলে লালচে রঙ ধারণ করে। খেতে মিষ্টি ও অত্যধিক রসালো। একেকটি ওজনে আধা কেজি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মেলায় আছে ব্যানানা ম্যাংগো। নামের সঙ্গে চেহারারও মিল আছে। কাঁচা অবস্থায় কলার মতো লম্বা-বাঁকা। পাকলেই হলুদ হয়ে যাচ্ছে। একেকটি আমের ওজন হয় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ গ্রাম। রাজশাহী আম গবেষণা কেন্দ্র আমটির জাত উদ্ভাবন করেছে।
 দেশের মাটিতেই ব্যানানা ম্যাংগোর চাষ সম্ভব বলে জানালেন বরিশাল নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'আমাদের স্টলে ৪০ প্রকার আমগাছ আছে। এর মধ্যে কয়েকটি জাত আছে সারা বছরই আম ধরে। কিছু আমের গাছ এনেছি এবারই প্রথম। এগুলোর দাম চারার আকৃতিভেদে এক হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। থাইল্যান্ডের কিউজাই, নামডক থাই, মহাচনক আমেরিকার কেইন আমের জাতগুলো বাংলাদেশে এবারই প্রথম। এ ছাড়া বারোমাসি ভারতীয় পুনাই ও থাইল্যান্ডের ডোয়ার আমও এবারই মেলায় প্রথম বলে জানালেন মো. ইব্রাহিম।
 বৃক্ষমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেল, মেলায় মোট ১১০টি স্টল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি স্টল আছে ১৯টি। বেসরকারি তিনটি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ৭৬টি। এ ছাড়া অন্যান্য স্টল আছে আরো ১২টি।
 সামাজিক বন বিভাগের স্টলের তত্ত্বাবধায়ক নুরুল হক জানান, তাঁদের স্টলে সাড়ে তিন শ ধরনের ঔষধি, কাঠ, ফলদ ও বনজ বৃক্ষের চারা আছে। তবে এগুলো কেবল প্রদর্শনীর জন্য। এসব চারা অন্য স্টলগুলোতে পাওয়া যাবে। সেখান থেকে ক্রেতারা কিনতে পারবেন।
 গতকাল বুধবার সকালে কথা হলো মেলায় গাছ কিনতে আসা অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব ও শুক্রাবাদের বাসিন্দা খোরশেদ আলমের সঙ্গে। তিনি কিনেছেন সজনে, পেয়ারা, কাগজি লেবু ও পোলাও পাতার গাছ। কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাড়ির ছাদে কিছু গাছ আগেই লাগিয়েছি। এবার আরো কয়েকটি গাছ কিনলাম। সজনে গাছটি কিনেছি ১০০ টাকায়, পেয়ারা চারা ১৫০ টাকা, পোলাও পাতার চারা ৫০ টাকায়।'
 পপি নার্সারিতে দেখা গেল বিপুলসংখ্যক ফল ও সবজি গাছের সমাহার। নানা ধরনের ফল থেকে শুরু করে বারোমাসি সবজির বীজ ও চারা বিক্রি হচ্ছে স্টলটিতে। নার্সারির এনামুল হক বলেন, 'আমাদের এখানে বারোমাসি মিষ্টি কুমড়া, করলা ও লাউয়ের বীজ রয়েছে। প্রতি প্যাকেট ৬০-৭০ টাকা দরে বিক্রি করছি। এই গাছগুলো যেকোনো সময় লাগানো যায় এবং ফলও সারা বছর পাওয়া যায়।'
 কাশবন নার্সারির বিক্রয়কর্মী হামিদ হাসান জানান, তাঁদের স্টলে দুই থেকে আড়াই হাজার জাতের গাছ আছে। এর মধ্যে নামডোকথাই নামের একটি থাই আম গাছ আছে। এগুলোর আম আকারে লম্বা এবং পাকলে হলুদ রং ধারণ করে। বেশ কয়েকটি গাছে কাঁচা-পাকা আম ঝুলতেও দেখা গেল। এ ছাড়া এ স্টলে আছে আপেল সদৃশ আপেল ম্যাংগো। প্রতিটি আপেল ম্যাংগোর ওজন প্রায় এক কেজি। হামিদ হাসান জানান, পলিথিনে থাকা এসব গাছের চারা এক হাজার, টবে থাকা চারা তিন হাজার ও ব্যারেলে থাকা গাছ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
 আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানায়, ১১ জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় দিনের মধ্যে মেলায় ৮০ হাজার ২০৪টি চারা বিক্রি হয়েছে। এর মূল্য ৪১ লাখ ৮৩ হাজার ৮০৮ টাকা। মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীও আসছে প্রচুর।

Thursday, 22 August 2013 15:34

হাটে হাঁড়িভাঙা

Written by

নানা বাহারি নাম আর স্বাদের আমের মধ্যে হাঁড়িভাঙা একটি। খুব বেশি দিনের কথা নয়। অন্য সব আমের তুলনায় এর কুলজি-ঠিকুজি বলা যায় হাল আমলের। অথচ এ স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই রসনা জয় করেছে হাঁড়িভাঙা। খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশজুড়ে।
 হাঁড়িভাঙা আমের উৎপত্তি রংপুরের মিঠাপুকুরে। একসময় রংপুরের ব্যাপক পরিচিতি ছিল তামাকচাষের জন্য। সেই জনপদ ধীরে ধীরে বিখ্যাত হয়ে উঠছে হাঁড়িভাঙার জন্য। মিঠাপুকুরে হাঁড়িভাঙার চাষ ও বিপণনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল জীবিকাচক্র। আমের হাট বলে পরিচিত বদরগঞ্জের পদাগঞ্জ হাটসহ বিভাগীয় শহর রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এ আমের হাট। এ ছাড়া সরাসরি বাগান থেকে এ আম কিনে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকার-ব্যবসায়ীরা।
 কথিত আছে, হাঁড়িভাঙার পথচলা শুরু মিঠাপুকুর উপজেলার উঁচাবালুয়া গ্রামের সোহরাব কাসারী নামের এক কুমারের হাত ধরে। তৎকালীন অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে তিনি মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ফেরি করে বিক্রি করতেন। একদিন তিনি পণ্য ফেরি করতে গিয়ে কোনো এক স্থান থেকে একটি আম সংগ্রহ করেন। বাড়িতে এনে খাওয়ার পর আমের আঁটিটি ছুড়ে ফেলেন পেছনের ঝোপে। আঁটিটি গিয়ে পড়ে মাটির ভাঙা হাঁড়ি-পাতিলের স্তূপে। সেখানে ওই আঁটি থেকে জন্ম নেয় একটি চারা। দিনে দিনে চারাটি বড় হয়। একপর্যায়ে গাছটিতে ধরে থোকায় থোকায় আম। প্রচলিত অন্যান্য আমের তুলনায় এ আম স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। অনেকেই খুঁজতে থাকে আমটির নাম। শেষ পর্যন্ত গাছটির জন্ম ভাঙা হাঁড়ি-পাতিলের মধ্যে হয়েছিল বলে এ আমের নাম হয়ে যায় 'হাঁড়িভাঙা'।
 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের দিকে মিঠাপুকুরে প্রথম হাঁড়িভাঙার কলম করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ আমের চাষ শুরু হয়। এ আমের চাষে আখিরা হাট গ্রামের আবদুস সালাম ও টেকানী গ্রামের লুৎফর রহমান অভূতপূর্ব সাফল্য পান। তা দেখে পাশের পদাগঞ্জ, পাইকারের হাট, মাদ্রাসাপাড়া, সরকারপাড়াসহ মিঠাপুকুরের বিশেষ করে খোড়াগাছ, ময়েনপুর, রানীপুকুর, চেংমারী, বালুয়া মাসিমপুর, মিলনপুর, বড়বালা, গোপালপুর ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের চাষিরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাঁড়িভাঙার চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
 কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মিঠাপুকুরে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। আমচাষির সংখ্যাও বাড়তে বাড়তে ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
 সরেজমিন মিঠাপুকুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাগানগুলোর গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে হাঁড়িভাঙা আম। বাগান পাহারা দেওয়া, গাছ থেকে আম সংগ্রহ আর ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় তা সরবরাহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ব্যবসায়ী, বাগান মালিক ও হাঁড়িভাঙা আম- এই তিনের চক্রে কর্মসংস্থান হওয়া মানুষের ব্যস্ততা সৃষ্টি করেছে উৎসবমুখর পরিবেশের।
 আখিরা হাট এলাকায় আট একর জমিতে 'দয়ার দান আম্রকানন' নামে বাগান গড়েছেন আবদুস সালাম। এ বছর গাছে মুকুল আসার আগেই বাগানটি বিক্রি হয়ে গেছে ১৩ লাখ টাকায়। আমচাষি আবদুস সালাম জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে লাখ লাখ টাকা দিয়ে আমের বাগান কিনে নেন। আবার কোনো কোনো চাষি নিজেরাই আম বিক্রি করেন। হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং কোনো আঁশ নেই। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা নিয়ে বাগান মালিকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
 রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ হচ্ছে এ অঞ্চলে হাঁড়িভাঙা আমের সবচেয়ে বড় পাইকারি হাট। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, পুরো রমজান ধরে এ আমের বিপণন চলবে। ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী মনতাজ মিয়া জানান, হাঁড়িভাঙা আম গত বছর শেষ পর্যন্ত আট হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ বছর দাম আরো বাড়তে পারে।
 রংপুর শহরের সিটি বাজার, নবাবগঞ্জ বাজার, জাহাজ কোম্পানী মোড়, লালবাগ, সিও বাজার, রেলওয়ে স্টেশন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙার হাট। ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বাজারে পাঠানোর পাশাপাশি এসব স্থানে আম বিক্রি করেন। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব হাট থেকে আম কিনে পাড়া-মহল্লায় ফেরি করে বিক্রি করছেন।
 রংপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। অন্যান্য জাতের আম যেখানে প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে হাঁড়িভাঙা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে।
 ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, 'হাঁড়িভাঙা আম বিক্রির মজাই আলাদা। এ আম যখন বাজারে আসে তখন প্রচলিত অন্য জাতের আম উধাও হয়ে যায়। ক্রেতারা হাঁড়িভাঙা নামে পাগল।' রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে আম কিনছিলেন খুলনা থেকে বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী নূরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী বিলকিছ বেগম। তাঁরা বলেন, 'অনেক দিন পর রংপুরে বেড়াতে এসেছি। বাচ্চাদের জন্য হাঁড়িভাঙা আম না নিলে কি হয়!' রংপুরের সিও বাজার এলাকার লোকমান মিয়া সিটি বাজার থেকে কেনেন ১০ কেজি আম। জানালেন, ছেলেমেয়ে ঢাকায় থাকে। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের জন্য এ আম পাঠাবেন। দেখা গেল এ আমকে ঘিরে রংপুরের কুরিয়ার ও পার্সেল সার্ভিসগুলোও রমরমা ব্যবসা করছে।
 হাটে আসা অন্য ক্রেতাদের মন্তব্য, 'হাঁড়িভাঙা আম অত্যন্ত সুস্বাদু। এর স্বাদ ও গন্ধ প্রচলিত ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, হিমসাগর, আম্রপালি জাতের আমকে ছাড়িয়ে গেছে।'

আম নিয়ে অনেক গল্প-গাথা ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। তবে গল্পের চেয়েও বেশি মজা আম খেতে। আমগাছঅলা মামাবাড়ি যাদের আছে, তাদের তো দারুণ মজা। গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি গিয়ে আম কুড়ানোর মজাই অন্য রকম। বুড়ো রবীন্দ্রনাথও ভুলতে পারেননি সে কথা-
 সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিক ঘুম-
 অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম;
 আম কুড়ানোর এই মজা দুনিয়ার আর কোথায় আছে? যদিও এখন দুনিয়ার অনেক দেশেই আম ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়েছে এই উপমহাদেশ থেকেই। এ অঞ্চলে আমের বয়স চার থেকে ছয় হাজার বছর। রামায়ণ ও মহাভারতে 'আম্রকানন' ও 'আম্রকুঞ্জ' শব্দ দুটো রয়েছে। রামায়ণ-মহাভারত রচিত হয় খ্রিস্টের জন্মের চার শ থেকে পাঁচ শ বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে সিন্ধু উপত্যকায় এসেছিলেন আলেকজান্ডার। এখানকার আমে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা আমের চারা নিয়ে যান মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মাদাগাস্কারে। দশম শতকে পারস্যের বণিকদের হাত ধরে আম যায় মধ্য এশিয়ায়। পর্তুগিজরা ভারতে আসে পনের শতকের দিকে। তাদের মাধ্যমেই দক্ষিণ আমেরিকা আর পশ্চিম আফ্রিকায় আম ছড়িয়ে পড়ে। এখন দুনিয়ার প্রায় সব উষ্ণ অঞ্চলে আমের আবাদ হয়। বিশেষ করে ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর মেক্সিকোয়।
 সংস্কৃতে টককে বলা হয় অম্ল বা অম্র। সেখান থেকে আম্র হয়ে আম। ওড়িয়া ভাষায় 'আঁব অ', মধ্যপ্রদেশে আঁবা, আমা, রাজস্থানে আঁবা, গুজরাটে অম্বো, মারাঠিতে আম্বা আর পাঞ্জাবি ভাষায় আম্ব। ইংরেজি ম্যাংগো শব্দটির উৎপত্তি তামিল শব্দ ম্যানগাই বা ম্যানকে থেকে। পর্তুগিজরা বলত ম্যানগা। ইতালিয়ান ভাষায় ম্যানগা শব্দটি প্রথম যুক্ত হয় ১৫১০ সালে। আমেরিকায় আমের আমদানি ঘটে সতের শতকে। বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করতে না পারায় আমেরিকার লোকজন আমের আচার বানিয়ে রাখত। ক্যাপসিকামের মতো দেখতে মিষ্টি মরিচ বেল পিপারকেও আচার বানিয়ে রাখত তারা। আচার বানিয়ে রাখা এসব ফলকে তারা বলত 'ম্যানগোস'। আঠার শতকে এই ম্যানগোস হয়ে গেল ম্যানগো।
 কত রকমের আম আছে দুনিয়ায়? আকার ও স্বাদভেদে হাজার রকমের। বাংলাদেশে আমের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী। সেরা নামের আমের মধ্যে রয়েছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, রানিপসন্দ, বেগমপসন্দ, বাদশাপসন্দ। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত উন্নত জাতের মজাদার আমের মধ্যে আছে বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪, আম্রপালি, মল্লিকা এবং দিনাজপুরের সূর্যপুরী। আর ভারতের সেরা আমের মধ্যে আছে আলফাঁসো, নীলম, বাঙ্গানপল্লী, মালগোরা, সুবর্ণরেখা, চোষা, দশেরি, ল্যাংড়া, গুলাবখাস, বোম্বাই ইত্যাদি। আর দুই দেশ মিলে বাহারি নামের আম আছে কয়েক শ। বাদশাহি, আলমশাহি, বৃন্দাবনি, দিলশাদ, কোহিনূর, কোহেতুর, ওয়াবজান, ফেরদৌস পসন্দ, সুলতান পসন্দ, ক্ষীরসাপাতি, জাফরান, শ্রাবণী, ভাদুরিয়া, বিসমনি, ভরত, বিড়া, ভোজ, বাবুই ঝাঁকি, চম্পা, চকচকি, দুধসর, দুধকুমার, দ্বারিকা, দুধভোগ, আক্কেল গরম, ডায়মন্ড, নীলম, দোকশলা, বারোমাসি, মিছরিভোগ, তোতাপুরি, কপটভাঙ্গা, হাতিঝুল, গৌরজিৎ আরো কত কী! সেগুলোর দেখা হয়তো কালেভদ্রে মেলে। কিন্তু নামের বাহার তো আছে! দুনিয়ায় এত নাম আর জাতের ফল দ্বিতীয়টি নেই।
 সবচেয়ে বড় জাতের আম ফজলি। ফজলির পূর্বনাম ছিল 'ফকিরভোগ'। ফকিরভোগ থেকে ফজলি হওয়ার পেছনে রয়েছে মজার এক গল্প। ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন। ভারতের মালদহ জেলার এক প্রাচীন কুঠিতে বাস করতেন ফজলি বিবি নামে এক বুড়ি। তাঁর বাড়ির আঙিনায় ছিল একটি আমগাছ। গাছটির বেশ যত্ন নিতেন বুড়ি। বড় বড় আর প্রচুর আম ধরত গাছে। খেতেও ছিল সুস্বাদু। ওই এলাকার নির্জনবাসী ফকির-সন্ন্যাসীদের এই আম দিয়ে আপ্যায়ন করতেন ফজলি বিবি। সে কারণে আমের নাম 'ফকিরভোগ'। একবার অবকাশ যাপনের জন্য মালদহ জেলার কালেক্টর র‌্যাভেনশ সাহেব আস্তানা গেড়েছিলেন ফজলি বিবির কুঠির কাছে। ফকিরভোগ আম নিয়ে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যান ফজলি বিবি। আম খেয়ে তো সাহেব মুগ্ধ। তখনই র‌্যাভেনশ সাহেব আমের নাম দিয়ে ফেলেন- ফজলি। সেই থেকে ফজলি আমের নাম মানুষের মুখে মুখে। ফজলি বিবির বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হয় ফজলি আমের জাত। কিষণভোগ জাতের আমের নাম দেওয়া হয় মিথিলার জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ ঠাকুরের নামে। মিথিলা হচ্ছে বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্য। একইভাবে রাজা-বাদশা, নবাব-বেগম কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কারো নামে আমের নামকরণ করা হয়।
 আমের সঙ্গে আমবাগানের কথাও আসে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের কারণেই তো আজ এত জাতের এত স্বাদের আম। বিহারের দ্বারভাঙ্গায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করিয়েছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। সে কারণে জায়গাটির নামই হয়ে গিয়েছিল লাখিবাগ। উপমহাদেশে এটাই উন্নত জাতের প্রথম আমবাগান। এদিকে গুটিকয়েক বিশ্বাসঘাতকের কারণে পলাশীর আমবাগানে ইংরেজদের কাছে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব সিরাজদ্দৌলা। আবার মেহেরপুরের আমবাগানেই গঠিত হয়েছিল প্রথম বাংলাদেশের সরকার। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন হয় ভারতে। এরপর চীন, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, বাংলাদেশ।
 দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় জনপ্রিয় ফলের তালিকায় আম বা কাঁঠাল থাকার কথা না। তবে আম উত্তর আমেরিকায় জন্মে। অবশ্য ওদের আম আর আমাদের আমের স্বাদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আসলে যে কোনো ফলের রয়েছে নিজস্ব পরিবেশ ও আবহাওয়া। আম এ উপমহাদেশের ফল। কাজেই এখানকার আমের স্বাদ দুনিয়ার সেরা। তবে এ উপমহাদেশ থেকে প্রচুর আম রপ্তানি করা হয় পশ্চিমা দেশগুলোতে। আর শীতপ্রধান দেশের মানুষও বুঝতে পেরেছে, এখানকার আমের স্বাদ কী! উৎপাদন হিসাব করলে দুনিয়ার জনপ্রিয় ফলের তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছে আম, সাড়ে তিন কোটি টন। ফল হিসেবে দুনিয়াজুড়ে আমের মতো এত ব্যাপকভাবে আর কোনো ফল ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। স্বাদেও আমের ধারেকাছে নেই কোনো ফল। এ জন্যই আমের নাম 'দ্য কিং অব ফ্রুটস'।
 গরমের এই ছুটিতে মামাবাড়িতে যাও বা না যাও, আম তো খেতে পারো। আর যারা মামাবাড়ি যাও তাদের জন্য একটা ধাঁধা-
 'নানার বাগানে আম পড়ল একটা, শুনল দুজন। যে দুজন শুনল সে দুজন গেল না। গেল অন্য দুজন। যে দুজন গেল সে দুজন ধরল না। ধরল অন্য দুজন। যে দুজন ধরল সে দুজন খেলো না। খেলো বত্রিশ জন। যে বত্রিশজন খেল তারা স্বাদ পেল না। কষ্ট করল অনেকে; কিন্তু স্বাদ পেল একজন।'
 আম খেতে খেতে ধাঁধাটা ভেদ করো তো দেখি। পাকা আম খেতে খেতেই না হয় জবাবটা দাও। কারণ আম খেলে কিন্তু বুদ্ধিও বাড়ে। দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন বাড়ল। যদি কঠিন মনে হয়, তবে বলেই দিচ্ছি। নানার বাগানে আম পড়ার শব্দ পেল দুই কান। কিন্তু আম আনতে ছুটে গেল দুই পা। আর আম তুলল দুই হাত। ওদিকে খেল বত্রিশ দাঁত। কিন্তু স্বাদ পেল কে? জিহ্বা।

Thursday, 22 August 2013 15:09

ড্রামে আম চাষ

Written by

আমগাছ খুব বড় হয়। তাই যেকোনো আমগাছ ড্রামে লাগানো যাবে না। ড্রামে লাগানোর জন্য বেছে নিতে হবে এমন সব আমের জাত যেগুলোর গাছ খাটো বা বামন ও ঝোপালো হয় এবং অল্প বয়স থেকেই আম দেয়া শুরম্ন করে। এ দেশে প্রাপ্ত জাতগুলোর মধ্যে আম্রপালি, লতা বোম্বাই, মলিস্নকা, নিলম, দশেরি, চৌষা, কেইট, শ্রাবণী, সিন্দুরী, বাউ আম-৩, বাউ আম-৭, বাউ আম-৯ (চৌফলা) ইত্যাদি জাত ড্রামে লাগাতে পারেন। আম্রপালি জাতের আম খুব মিষ্টি ও বেশ কয়েক দিন ঘরে রেখে খাওয়া যায়, গাছে ধরেও প্রচুর। বাউ আম-৯ জাতটি নিয়মিত ফলধারী বামন প্রকৃতির গাছ, এ গাছে বছরে তিন-চারবার আম ধরে। তাই সৌখিন ফলচাষিরা ছাদে ড্রামে বা টবে এ জাতটি চাষ করতে পারেন। বাণিজ্যিকভাবে এটা চাষ না করা ভালো। এ ছাড়া থাইল্যান্ড থেকে আসা ‘নাম ডক মাই’ জাতটিও ড্রামে লাগাতে পারেন। আশপাশের বিশ্বসৱ নার্সারি বা সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারগুলো থেকে এসব জাতের কলম কিনতে পারেন।
 মে-জুন মাসে ড্রামে আমের কলম লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। হাফ ড্রাম হলে ভালো হয়। ড্রামের জন্য সারমাটি তৈরি করতে হবে। টবের জন্য দোঁয়াশ মাটি নেবেন। মাটির সাথে চার ভাগের এক ভাগ বা ১০ কেজি গোবর সার বা ড্রামপ্রতি চার কেজি প্যাকেটের কম্পোস্ট সার, ১০০-১৫০ গ্রাম এমওপি (পটাশ) সার, ২০০-২৫০ গ্রাম টিএসপি (ফসফেট) সার, এক কেজি হাঁড়ের গুঁড়া, ৫০ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম সালফেট সার মিশিয়ে নিন। এসব সারমাটি ড্রামে ভরার আগে ড্রাম থেকে যাতে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে সে জন্য ড্রামের তলায় ছিদ্র করে নিন। ছিদ্রের মুখে তিন দিকে পুরনো মাটির টব ভাঙা টুকরো এমনভাবে দিন যাতে ছিদ্রের মুখ বন্ধ না হয়। এর ওপর আর একটা টুকরো দিয়ে ঢেকে পাতলা সৱর করে খড় বিছিয়ে দিন। তারপর সারমাটি দিয়ে ড্রাম ভরে দিন। ড্রামের মাঝখানে সোজা করে জুন-জুলাই মাসে আমের কলম পুঁতে দিন। কলম লাগানোর পর পানি দেবেন। কলম যদি বেশি লম্বা হয় তাহলে মাটিতে লেগে গেলে আগা কেটে কিছুটা খাটো করে দিতে পারেন। এতে পরে গাছ ভালো ঝোপাল হবে।
 জুন-জুলাইতে লাগানো কলমের গাছে জানুয়ারি-ফেব্রম্নয়ারিতে মুকুল আসবে। তবে প্রথম বছর সেসব মুকুল না রেখে সব ভেঙে দেবেন। পরের বছর আসা মুকুল রেখে আম ফলাবেন। প্রতি বছর বর্ষার আগে ও পরে ড্রামের মাটিতে গোবর ও অন্যান্য সার দেবেন। বছরে একবার প্রতি ড্রামে চারটি করে ট্যাবলেট সার পুঁতে দিতে পারেন। ট্যাবলেট সার দিলে শুধু গোবর সার দেবেন, অন্য কোনো সার দেয়ার দরকার হবে না। চার-পাঁচ বছর অনৱর গাছের গোড়া থেকে খানিকটা মাটি সরিয়ে কিছু শিকড় ও ডালপালা ছেঁটে দেবেন। বর্ষার আগে এ কাজ করতে হবে। জুন-জুলাইতে যখন আম তুলবেন, দু-তিনটি পাতাসহ বোঁটা কেটে তুলবেন। এতে পরের বছর ভালো আম ধরবে। মুকুল ও গুটি ঝরা কমাতে পস্ন্যানোফিঙ হরমোন মুকুল বের হওয়ার ঠিক আগে ও ঠিক পরে দু’বার স্প্রে করতে পারেন। এ সময় ছত্রাকনাশক ও কীটনাশকও ছিটাতে পারেন। গুটি মারবেলের মতো হলে সে সময়ও একবার ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক ছিটাতে পারেন। এতে আমগাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হবে। ড্রাম রাখবেন ছাদে খোলা জায়গায়, যেখানে সারা দিন রোদ পড়ে। ড্রাম ছাদের ওপর এমনভাবে রাখবেন যাতে ছাদ থেকে ড্রাম কিছুটা উঁচু বা ফাঁকা থাকে। এতে ছাদের ৰতি হবে না। এ জন্য ড্রামের তলায় চার পাশে চারটি ইট দিয়ে উঁচু করে দিতে পারেন। ড্রামে ছয়-সাত বছর গাছ রাখার পর সেটা সরিয়ে নতুন গাছ লাগালে ভালো হয়।

সুমিষ্ট আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম এবার সরকারি পর্যায়ে বিদেশে রফতানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র থেকে পাঠানো আমের নমুনা ইউরোপীয় ইউনিয়নে গৃহীত হওয়ায় স্বনির্ভর অর্থনীতির নতুন এই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে চলেছে। এর ফলে এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুস্বাদু আম ইউরোপে রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতি বছর দেশে উত্পাদিত মোট আমের সিংহভাগই উত্পাদিত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। জেলায় এখন আমের আবাদকৃত জমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৬ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেই উত্পাদিত হয় ২ লাখ মেট্রিক টন। এই বিপুল পরিমাণ আম শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদেশে উপহার হিসেবে পাঠানো ছাড়া কখনই রফতানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত প্রতি বছর ৪১ হাজার মেট্রিক টন আম বিদেশে রফতানি করে থাকে। এমনকি পাকিস্তানও প্রতি বছর গড়ে ৪৭ হাজার মেট্রিক টন আম বাইরে পাঠায়। ভারত ও পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে উত্পাদিত আমও বিদেশে রফতানির জন্য সরকারি কৃষিজ উত্পাদন রফতানিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হরটেক্স ফাউন্ডেশন বারবার চ্যানেল সৃষ্টির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় জাপান ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে আম আমদানির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। সে হিসেবে যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জাপানে আম রফতানির চেষ্টা করে সরকারি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে জাপান অনাগ্রহ দেখালেও তাদের কাছে আমের নমুনা পাঠানো হয়। হরটেক্স ফাউন্ডেশন গত ৩০ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র উদ্ভাবিত বারি-২ জাতের আমের নমুনা বাবদ প্রায় ২০ কেজি আম পাঠিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এক ফ্যাক্স বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছে, উত্কৃষ্টমানের এই আমের নমুনা তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। প্যারিস থেকে পাঠানো এই ফ্যাক্স বার্তাটি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে এসে পৌঁছলে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফল বিজ্ঞানী মোঃ সরফ উদ্দিন জানান, এই প্রথমবারের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র উদ্ভাবিত বারি-২ আম বিদেশে রফতানির যোগ্যতা অর্জন করেছে। এর ফলে বিদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রফতানির একটি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে বিদেশে রঙিন জাতের আমের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ২০০৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়েছিল রঙিন জাতের আম প্রদর্শনী। এখানে প্রদর্শিত ৮৭ জাতের আমের মধ্যে ৩৩টি জাতকে উত্কৃষ্টমানের বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এসব জাতের রঙিন আমকে বিদেশে রফতানির জন্য গুণগতমান নিশ্চিত করতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা।

ফজলি আমের ভারে গাছটি এমন ন্যূব্জ হয়ে পড়েছে যে, ঘাসের ওপর শুয়েও আম মুখে নেওয়া যাবে। আর আমবাগানে বসে যদি আমের রসে দু’হাত লেপ্টে মুখ ভরিয়ে নেওয়া যায়, তবে ফলের রাজার সত্যিকারের স্বাদ পাওয়া যায়।

ফলের রাজার রাজ্য ঘুরতেই চাপাইনবাবগঞ্জে যাওয়া। চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাটবাজারগুলোতে এখন আমের জমজমাট ব্যবসা। বিভিন্ন জাতের ও বিভিন্ন স্বাদের রসালো আমের গন্ধে ভরে আছে এ সব বাজার।

আমবাগানে গেলেই যে আম কুড়োনো যাবে, সেটা কিন্তু সত্যি নয়। বাগান মালিকের অনুমতি না নিয়ে আম ছেঁড়াটা ভয়ানক অপরাধ!

আর এ জন্যই বাগানগুলোতে সাধ্যমতো দেওয়া হয়েছে কাঁটাতারের প্রাচীর। পাহারাও দিচ্ছে নিয়োগ দেওয়া প্রহরীরা।

বাগানের ভিন্ন ভিন্ন দিকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির আম। শিবগঞ্জ বাজারের পশ্চিমের একটি বাগানে প্রবেশ করে দেখা যায়, গাছগুলো ঝুঁকে পড়েছে আমের ভারে। বিভিন্ন ওজনের ও আকৃতির আম রয়েছে বাগানে। বাঁশ দিয়ে ঠেলা দিয়ে রাখা হয়েছে বেশি নুয়ে পড়া ডালগুলোকে।

কত রকম আর প্রকারের আম! বাগানের চাষী রফিক বাংলানিউজকে জানান, ইতোমধ্যে, গোপালভোগ আম শেষ হয়ে এসেছে। ল্যাংড়া আর হিমসাগরও শেষের দিকে। এখন ফজলি আর সুরমা ফজলি আমের মৌসুম।

বছরের এ সময়ে লাখ মানুষের কর্মব্যস্ততা আর প্রাণচঞ্চলতায় মুখরিত গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আম কিনতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের ভিড়ে মুখরিত কানসাট।
 
এলকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার শিবগঞ্জ, সদর, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট এবং নাচোল উপজেলার আমবাগান থেকে শুরু করে হাট পর্যন্ত আমের উৎসব লেগেই আছে। ল্যাংড়া, লণভোগ, রিসাপাত, মিছরিদানা, কালীভোগ, বৃন্দাবনীসহ বিভিন্ন স্বাদের গুটি আম পুরোদমে কেনাবেচা হচ্ছে।

ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস ও কুরিয়ার সার্ভিসে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চলে যাচ্ছে দূর-দূরান্তে। রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে যে সব ট্রেন ছেড়ে আসছে, সেগুলোতেও ঝাঁপিভর্তি আম।  
 
কানসাট বাজারের আম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন সারা বছরই আমের বেচাকেনা চলে। আমের লাভও ভালো।

মুরিদপুরের আম ব্যবসায়ী জিহাদ বাংলানিউজকে বলেন, “অন্যান্য ফসল আবাদে যে পরিমাণ খরচ হয়, আম ফলাতে সে তুলনায় খরচ কম। গাছ ও আমবাগানের পরিচর্যাসহ রোগবালাই দমনেও খরচ পড়ে কম।”

আমের আড়ৎদার আফতাবউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, “আমের উৎপাদন এখন আর মৌসুমের ওপর নির্ভর করে না। কারণ, আগের তুলনায় আমের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সারাবছর আমগাছ ও আমবাগানের পরিচর্যা করেন ব্যবসায়ীরা। বাগানের ক্রেতাদের পরিচর্যায় ফল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ।”
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগান মালিক, আম চাষী, ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতারা আম বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন।

ব্যাংক থেকে শুরু করে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যস্ত হয়ে পড়ে এ সময়টায়। আমের মৌসুমে তাদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়।

আমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য-সামগ্রীর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোও চাঙা হয়ে ওঠে। নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর পাশাপাশি গড়ে ওঠে নতুন নতুন অস্থায়ী খাবার দোকান।

এখনকার পুরো অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন আম। গাছ থেকে আম পেড়ে আড়তে নিয়ে এসে টুকরিজাত (বাঁশের ঝুড়ি) করে ট্রাকে লোড দেয় নির্দিষ্ট শ্রমিকেরা। আরেক শ্রেণীর শ্রমিক টুকরি বানান। আবার এসব টুকরির জন্য জেলার বাইরে থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে টুকরির মালিকদের কাছে বিক্রি করেন অনেকেই।

তবে বর্তমানে টুকরির বদলে ক্যারেটও ব্যবহৃত হচ্ছে। গোটা মৌসুম জুড়ে আমবাগান মালিক ও আম চাষীদের পাশাপাশি এক শ্রেণীর মানুষ আম বেচাকেনা করে রোজগারের পথ সৃষ্টি করেন।

সে সঙ্গে ফড়িয়ারাও এ সময় দু’পয়সা ইনকাম করেন। বাগান থেকে আম পরিবহন করে বাজারে বা আড়তে পৌঁছে দিতে রিকশা-ভ্যানচালকেরা এ সময় বেকার থাকেন না। বাস-ট্রাকগুলো বেশি ভাড়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ভিন্ন জেলায় আম পৌঁছে দেয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের সাধুরঘাট, পৌর মার্কেট, রাণীহাটি, মহারাজপুর, মল্লিকপুরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আমের আড়ৎ।

কানসাটে আম ব্যবসায়ী ফরিদুল আলম, আব্দুল খালেকসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ল্যাংড়া প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে, দুই হাজার পাঁচশ টাকা থেকে তিন হাজার টাকায় ও গুটি আম এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় পর্যন্ত। ফজলি আর সুরমা ফজলি বিক্রি হচ্ছে, প্রতি মণ এক হাজার পাঁচশ থেকে দুই হাজার টাকায়।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ২৩ হাজার ৭০ হেক্টর আমবাগান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে চাঁপাই সদর উপজেলায় তিন হাজার সাতশ ৮০ হেক্টর, গোমস্তাপুর উপজেলায় দুই হাজার আটশ ৫৫ হেক্টর, শিবগঞ্জ উপজেলায় ১২ হাজার সাতশ ৮৫ হেক্টর, ভোলাহাট উপজেলায় দুই হাজার হেক্টর এবং নাচোল উপজেলায় এক হাজার ছয়শ ৫০ হেক্টর এবং আম গাছ রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ১৪ হাজার নয়শটি।

শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও খায়রুল মনের অদ্যম ইচ্ছা শক্তি সাহস নিয়ে আমবাগান লিজ নিয়ে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রজাতির আম চাষ করে নিজে লাভবান হয়েছেন, পাশাপাশি তার অধীনে ৭০টি পরিবার কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছে। প্রতিবন্ধী হয়েও যে স্বাবলম্বী হওয়া যায় তার প্রমাণ রেখেছেন প্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলাম (৪৮)। তবে কয়েকদিনের বন্যায় তার বাগানে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তারপরও বর্তমানে তিনি সব মিলিয়ে ৫০ লাখ টাকার মালিক। তবে সরকার বা  ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ তিনি পাননি। প্রতিবন্ধি খায়রুল এখন কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

খায়রুল ইসলাম জানান, অভাব অনটনের সংসারে ২০০১ সালে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শারিরীক প্রতিবন্ধীতে পরিণত হন খায়রুল। দুঃসময়ে নিজের স্ত্রী সন্তান তাকে একা ফেলে চলে যায়। মানুষ তাকে করুণার চোখে দেখতে থাকে। মনের ক্ষোভ ও জেদের বশে খায়রুল নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করতে থাকে।

২০০৩ সালে ব্যাংকের জমানো এসপিএস-এর ২০ হাজার টাকা ভাঙ্গিয়ে মানুষের সাথে ফলের ব্যবসায় নামেন তিনি। প্রতিবন্ধী এই মানুষটি শুধু মনের জোরেই নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে মানুষের বাগান লিজ নিয়ে তাতে বিভিন্ন প্রজাতির আম আবাদ করে গত ১০/১২ বছরে কয়েক লক্ষ টাকার মালিক হয়েছেন তিনি।

প্রতিবন্ধী খায়রুল গড়ে তোলেন বোচাগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর পি,এস,পি এগ্রো বাগান। প্রায় ১০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ রয়েছে এই বাগানে। খায়রুল ইসলাম ৩ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন এই বাগানটি। পাশাপাশি আরোর ১০টির মত ছোট বড় আম বাগান প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে লিজ নিয়েছেন তিনি। এ বছর আম হয়েছে ভাল তাই খরচ বাদ দিয়ে লাভের মুখ দেখবেন তিনি। খায়রুল নিজের বাগান নিজেই পরিচর্চা করেন। ফরমালিন বা বিভিন্ন ঔষধ মিশিয়ে আম না পাকিয়ে বরং তিনি বাগানের আম গাছে পাকানো অবস্থায় বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারজাত  করেছেন।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা তার বাগানের আম্রপলি, ল্যাড়া, সূর্যপুরি, গোপালভোগ, মিশ্রিভোগসহ নানা প্রজাতির আম দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকেন। প্রতি বছরই ১০/১২টি বাগান লিজ নিয়ে তিনি নিজে সহ প্রায় ৭০টি পরিবারের মানুষ এখন সাবলম্বির পথে। এক সময়ের দরিদ্র কৃষক খায়রুল এখন কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

তার পিএইচপি অ্যাগ্রো সুলতানপুর, বোচাগঞ্জ বাগানের ইনচার্জ ফরষ্টে ইঞ্জিনিয়ার মো. মহিদুর রহমান জয়-এর সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে প্রতিবন্ধি খায়রুল অনুপ্রাণিত হয়েই ব্যাপক সাফল্য ও সুনাম অর্জনের পাশাপাশি এখন আর্থিকভাবে সাবলম্বি।

এই মৌসুমে নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার আম ব্যবসায়ী, আমের আড়ৎদার এবং আম চাষীরা লাভবান হচ্ছেন। নাটোর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাগাতিপাড়া উপজেলার ব্যবসায়ীক প্রাণকেন্দ্র তমালতলাতে অবস্থিত এই বাজার। প্রতি শুক্র ও সোমবার হাট থাকলেও এখন প্রতিদিনই হাট বসছে। উপজেলাতে প্রচুর পরিমাণে আম, লিচু, কাঠালসহ অন্যান্য ফলের বাগান থাকলেও শুধু এই মৌসুমকে ঘিরে এই বাজারে ২৫টির মত আমের আড়ৎ রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন এলাকায় আমের বাগান ক্রয় করে। সেই আম ভেঙ্গে আড়তে নিয়ে আসে। অনেক বাগান মালিক রয়েছে যারা সরাসরি আড়তে আম বিক্রি করে, তাতে তারা লাভও পাচ্ছে বেশি। ঢাকা থেকে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী আড়তের মাধ্যমে আমগুলো ক্রয় করে। পাইকার ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল, হাওলার, শিপন জানান, এখানে সবরকম আম দেখে কেনার সুযোগ রয়েছে। তাই আমরা এই আম ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ফেনী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাই। দিনে প্রায় দুই হাজার টনের মত আম বেচা-কেনা হয় এখানে। তাতে প্রায় ৮০লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এই আমগুলো রাজশাহীর বাঘা, আড়ানি, পুটিয়া, তাহেরপুর, নওগাঁর আত্রাই, রানীনগর, জয়পুর হাট, আক্কেলপুর, দিনাজপুরসহ দূর দূরান্ত থেকে আসে। আড়ৎ হওয়ায় এলাকার অনেক শ্রমিকও কাজের সুযোগ পেয়েছে। একজন শ্রমিক কমপক্ষে ছয় থেকে নয়শত টাকা মজুরি পায়। এখানে যে সমস্ত আম আসে তার মধ্যে আম হিসাবে খেরসা, কালুয়া, রানীপছন্দ, লকনা, কৃঞ্চকলী, আম্রপালী, ফজলি, আশ্বিনা, কৃষানভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, কুয়াপাহাড়ী, ফোনিয়া, মল্লিকা উল্লেখ্য। আড়ৎদার, পাইকার ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বাগান মালিক সকলে বললেন এলাকার ব্যবসায়ীক পরিবেশ ভালো কিন্তু টাকা লেনদেন করার জন্য এখানে ব্যাংক নেই। তাই এলাকাবাসী ব্যাংক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

Page 12 of 18