x 
Empty Product

ইসলামপুরের গাইবান্ধা ইউনিয়নের আগুনেরচরে একটি আম গাছের গোড়া থেকে গজিয়ে উঠেছে হাতসদৃশ মসজাতীয় উদ্ভিদ বা ছত্রাক। ওই ছত্রাককে অলৌকিক হাতের উত্থান এবং ওই হাত ভেজানো পানি খেলে যেকোন রোগ ভাল হয় বলে অপপ্রচার করছে স্থানীয় ভ- চক্র। আর ওই ভ-ামির ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছেন শত শত মানুষ।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, ইসলামপুরের গাইবান্ধা ইউনিয়নের আগুনেরচর এলাকায় কিতাব আলীর পুকুরপাড়ে কয়েক বছর আগে কেটে ফেলা আম গাছের গোড়ার নিচ থেকে মসজাতীয় দুটি ছত্রাক বেরিয়েছে। ছত্রাক দুটির মধ্যে একটি দেখতে অনেকটা মানুষের হাতের মতো। ওই হাতসদৃশ ছত্রাককে স্থানীয় এক চক্র অলৌকিক হাতের উত্থান বলে অপপ্রচার করছে এবং অলৌকিক ওই হাত ভেজানো পানি খেলে মানুষের রোগ ভাল হয় । তারা হাতসদৃশ ছত্রাকের জায়গাটি মাজারের রূপ দিয়ে সাজিয়ে সেখানে স্থানীয় নাপিতেরচর গ্রামের পলাশ নামের এক অর্ধপাগলকে বসিয়ে তাকে দিয়ে আগন্তুকদের হাতে বোতলভর্তি পানি দিচ্ছে এবং নগদ টাকাপয়সা আদায় করছে। ওই অপপ্রচারে মুগ্ধ হয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন শত শত মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন সেখানে এসে যে যার মতো করে টাকা দান করে বোতল ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে রোগ মুক্তির আশায়। আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন ওইসব মানুষের আগমনে জোয়ার তুলতে স্থানীয় চক্র সেখানে কিছু পাগলকে ডেকে এনে গান-বাজনা করাচ্ছে ও গঞ্জিকার আসর বসিয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় চক্রটি মৃত আম গাছের গুঁড়িসহ হাতের মতো ছত্রাকটি লাল সালু কাপড় ও রং-বেরঙের জড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে সেটিকে জিন্দা পীরের হাতের মাজার বলে অপপ্রচার করছে। এ ঘটনাকে ধর্মপ্রাণ মানুষজন শিরক ও বেদাত বললেও সেখানে উৎসুক দর্শনার্থী ও রোগ মুক্তির আশায় হাতসদৃশ ছত্রাক ভেজানো পানি নেয়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের ভিড় দিন দিন বাড়ছে।

সংবাদ সম্মেলন নড়াইলে হত্যা মামলা তুলে নিতে হত্যার হুমকি

নিজস্ব সংবাদদাতা, নড়াইল, ৩ অক্টোবর ॥ খড়ড়িয়া গ্রামে জমিজমার বিরোধকে কেন্দ্র করে বিজিবি সদস্য আলী আজগর মিনা হত্যাকা-ের ঘটনায় আসামিরা মামলা তুলে নিতে বাদীপক্ষকে হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিচ্ছে। মামলার প্রধান আসামির আত্মীয় লে. কর্নেল পদমর্যাদার এক ব্যক্তির প্ররোচনায় চার সাদা পোশাকধারী বাদীর বাড়িতে গিয়ে নিহতের স্ত্রীকে মামলা তুলে না নিলে সন্তানসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে। সোমবার দুপুরে নড়াইল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত অভিযোগ করেন নিহতের স্ত্রী নাছিমা খাতুন বুলু এবং নিহতের ভাই মামলার বাদী ইকবাল হোসেন মিনা।

নিহত বিজিবি সদস্য আলী অজগর মিনার স্ত্রী নাছিমা খাতুন বুলু এবং ভাই মামলার বাদী ইকবাল হোসেন মিনা লিখিত অভিযোগে জানান, ১৫ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে সাদা পোশাকধারী অপরিচিত চারজন তাদের বাড়িতে এসে মামলা তুলে নেয়ার নির্দেশ দেয় এবং বলে মামলা তুলে না নিলে আজগরের দুই সন্তান আশিক ও ইয়াসিনসহ পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হবে। তারা অভিযোগে জানান, মামলার প্রধান আসামি রাজা মোল্যার খড়ড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা লে. কর্নেল পদমর্যাদার মামাত ভাইয়ের প্ররোচনায় এ হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই সেনা কর্মকর্তা মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের চাপপ্রয়োগ করে আসছে। এ অবস্থায় দুই শিশুসন্তান নিয়ে আজগরের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। কালিয়া উপজেলার পেড়লি ইউনিয়নের খড়ড়িয়া গ্রামে মিনা ও মোল্যা বংশের মধ্যে জমিজমার বিরোধকে কেন্দ্র করে ৮ সেপ্টেম্বর মোল্যা বংশের লোকেরা আজগরকে তার বাড়ির সামনে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

অবশেষে শেরপুরে জেল সুপারসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব সংবাদদাতা, শেরপুর, ৩ অক্টোবর ॥ জেলা কারাগারে জামিনে মুক্ত আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রতিবাদ করায় কারারক্ষীদের হাতে পরিবহন শ্রমিক নেতা আলমগীর হোসেন বিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে। সোমবার দুপুরে আহত শ্রমিক নেতা বিশুর স্ত্রী শান্তি বেগম বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করলে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুর রহমান তা গ্রহণ করেন এবং বিকেলে দেয়া আদেশে জখমীর ডাক্তারী সনদপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে ঘটনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় জেল সুপার মজিবুর রহমান ও প্রধান কারারক্ষী বাবুল মিয়াসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে জমে উঠেছে আমের বাজার। এসব বাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার উপরে আম বেচা-কেনা হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের আম ব্যবসায়ীদের ভিড় এখন রাজশাহীসহ আশপাশের বাজারগুলোতে। এই কেনা বেচাকে কেন্দ্র করে এখানকার হাট-বাজারসহ আমভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য গোটা অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনেছে ব্যপক পরিবর্তন। একই কর্ম সংস্থান হয়েছে বহু বেকার মানুষের। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে যেন এক উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
এবার প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে এবার সঠিক সময়ে জমে উঠেছে রাজশাহীর আমের বাজার। অপরিপক্ক আমে কেমিক্যালের মিশ্রণ নয়, এবার উপযুক্ত সময়ে পাকা আমে ভরে উঠেছে রাজশাহীর বাজার। আমের জন্য প্রসিদ্ধ রাজশাহীজুড়ে এখন আম আর আম। শহরের পাড়া মহল্লার অলিগলি থেকে গ্রামের হাটবাজার সর্বত্রই এখন আমের বাজার। তাই আমকেন্দ্রিক বাণিজ্য নিয়ে এখন ব্যস্ত রাজশাহীর লাখো মানুষ। প্রতিবছর এ অঞ্চলে প্রায় ২৫০ জাতের আম উৎপন্ন হয়। তবে এবার ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, লকনা ও মোহনভোগ জাতের আমের চাষ বেশি হয়েছে। রাজশাহীর প্রায় সব এলাকাতেই আমের আবাদ হয়। এর মধ্যে রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট ও পবা উপজেলায় আবাদ হয় বেশি। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০০৭-০৮ মৌসুমে রাজশাহীতে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল সাত হাজার ৮৫৪ হেক্টর এবং গাছ ছিল ছয় লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৪টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় এক লাখ দুই হাজার ৯৫০ টন। ২০১১-১২ মৌসুমে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৯৮৬ হেক্টর এবং গাছ ছিল ১০ লাখ ৬ হাজার ৮৮১টি। ওই বছর আম উৎপাদিত হয় এক লাখ ১০ হাজার ৪৮৮ টন। হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ১২ দশমিক ২৯ টন। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে গত বছর অর্থাৎ ২০১২-১৩ মৌসুমে রাজশাহীতে আমের উৎপাদন হয় দুই লাখ ১২ হাজার ৭৬৭ টন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি ২০১৩-১৪ মৌসুমে আমের আবাদ হয়েছে ১৪ হাজার পাঁচ হেক্টর জমিতে। এই জমিতে গাছ রয়েছে ১৪ লাখ ২১ হাজার ৫০৩টি এবং কৃষক ৪০ হাজার ২১৩ জন। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে গতবারের সমান উৎপাদন অর্থাৎ দুই লাখ ১২ হাজার ৭৬৭ টন। হেক্টর প্রতি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ দশমিক ১৬ টন। সব মিলিয়ে গত ছয় বছরে রাজশাহীতে আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ছয় হাজার ১৫১ হেক্টর, গাছ বেড়েছে সাত লাখ ৪১ হাজার ৮১৯টি, আর আমের উৎপাদন বেড়েছে এক লাখ ৯ হাজার ৮১৭ টন। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, রাজশাহীতে প্রতি বছরই বাড়ছে আমের আবাদ। গত ছয় বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি জমি এসেছে আমবাগানের আওতায়। ফলন ও লাভ বেশি হওয়ায় অনেকেই এখন আম আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। আগামী দুই থেকে তিন মাস জুড়ে চলবে আমের মহোৎসব। প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে এবার রাজশাহীর আম বাগানগুলোতে আমের ফলন খারাপ হয়েছে। তবে গত বারের থেকে এবার বেশি জমিতে আম চাষ হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আম আসে বানেশ্বর বাজারে। প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে আম বেচা-কেনা। চারদিকে তাকালেই শুধু দেখা যায় আম আর আম। বাজারজুড়ে পাইকারি ও খুচরা আম বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এ আমের কেনাবেচা।
এসব আম ট্রাকে করে চালান হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। কয়েক হাজার মানুষ এসব কাজে নিয়োজিত থাকেন। দিনরাত চলে এই কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী পুরো দুই থেকে তিন মাসই এ মোকামে অবস্থান করেন।
বাজারে বর্তমানে গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ২৪০০ থেকে ২৬০০ টাকায় এবং লেংড়া ও হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা এবং পাইকারী বাজারে মূল্য ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। এদিকে প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১২ ট্রাক আম পাঠানো হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতি ট্রাকে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ ক্যারেট (প্লাস্টিকের ঝুড়ি) আম পাঠানো হয়। এছাড়া গন্তব্য সহজে আম পাঠানোর জন্য রয়েছে কুরিয়ার ও পার্সেল সার্ভিসগুলো। এদিকে কেবল হাট-বাজার নয়, আমকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য পাল্টে দিয়েছে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতিও। রাজশাহী অঞ্চলের দু’টি বড় আমের মোকাম রাজশাহীর বানেশ্বর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে প্রতিদিন বেচাকেনা হচ্ছে দুই কোটি টাকার আম। আমের কারবার নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় লাখ মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থানও হয়েছে। মধুমাস জ্যৈষ্ঠের পরও জুনের পুরো মাস জুড়েই চলবে ‘আম বাণিজ্য’। তাই গাছের আম নামানোর পারদর্শী থেকে আম চালানের ঝুঁড়ি বানানো এবং বাজারগুলোতে নানা সহায়ক কাজে নিয়োজিত লোকজনের কর্মসংস্থানে গ্রামীণ জনপদ ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। আম বাণিজ্যের কারণে অর্থবছরের শেষ দিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও বেড়েছে লেনদেনের হার। উৎপাদন বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, এবার রাজশাহীতে অন্তত সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

চলতি মৌসুমে ফুরিয়ে আসছে রাজশাহীর সুস্বাদু নানান জাতের আম। শেষ হতে চলেছে পাকা আম ঘিরে মাস চারেকের বিশাল কর্মযজ্ঞও।

আমের মৌসুমে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয়ে ওঠে। প্রান্তিক আম চাষি থেকে বেকার যুবক কারোরই ফুরসৎ থাকে না। গতবার আম শেষ হয়ে গিয়েছিলো বর্ষার আগেই। কিন্তু এবার ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে এখনও শোভা পাচ্ছে আম। তবে দাম বেশি হওয়ায় দোকানে ক্রেতা কম।

রাজশাহীর আমের বাজার থেকে এরই মধ্যে গোপালভোগ, মোহনভোগ, কালিভোগ, লক্ষণভোগ, ল্যাংড়া, হিমসাগর বিদায় নিয়েছে। এখন বাজারে অল্প সংখ্যক ফজলি আর আশ্বিনা আম মিলছে।

শিরোইল এলাকার আলম ফল ভাণ্ডারের বিক্রেতা শফিকুল বাংলানিউজকে জানান, সরবরাহ কমে গেছে। মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। যা ফজলি আছে আগামী সপ্তাহে হয়তো আর পাওয়া যাবে না। তবে আশ্বিনা আম আরও দু’সপ্তাহ থাকবে। এর মধ্যে স্বাদে মিষ্টি ফজলি। তবে দামও বেশি। আর আশ্বিনা টক। দামও কম।

তিনি বলেন, বুধবার মহারাজা ফজলি আট হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়েছে। আর আশ্বিনা বিক্রি হয়েছে তিন হাজার ২শ’ টাকা মণ দরে। তবে দু’দিনের মধ্যে এ দাম আরও বাড়বে।

আমান ফল ভাণ্ডারের মালিক আমানুল হক বলেন, চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই আড়তগুলোতে আমের আমদানি কমে এসেছে। আম ঘিরে কমে যাচ্ছে সেই নির্ঘুম ব্যস্ততা। নেই তেমন বিক্রি-বাট্টা। সেই সঙ্গে বেড়ে গেছে দামও। তাই স্থানীয় ক্রেতারা আমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

যারা শিরোইল বাস টার্মিনাল হয়ে ঢাকা যাচ্ছেন তারাই স্বজনদের জন্য শখ করে শেষ মুহূর্তের আম নিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকের ছেলে-মেয়ে ঢাকা থাকায় তাদের জন্য আম পাঠাচ্ছেন। কুরিয়ার সার্ভিস ও অন্য পরিবহনের মাধ্যমে রাজশাহী থেকে দেশের দূর-দূরান্তে আম পাঠানোও কমে গেছে।

শালবাগান এলাকায় থাকা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান, আগের মতো এখন আর ব্যস্ততা নেই। গ্রাহকদের আম পাঠানো একেবারেই কমে গেছে। ভরা মৌসুমের তুলনায় এখন পাঁচভাগ আমও বুকিং হচ্ছে না।

বেঁধে দেওয়া সময়ানুযায়ী এবছর ২৫ মে থেকে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম ভাঙা শুরু হয়। এই নিয়মে ক্ষিরসাপাত ও লক্ষণভোগ আম ভাঙা হয় ১ জুন, ল্যাংড়া ও বোম্বাই ১০ জুন, ফজলি ২৫ জুন। এছাড়া আম্রপালি ১ জুলাই এবং আশ্বিনা ১৫ জুলাই ভাঙা হয়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কার্যালয়ের কৃষি কর্মকর্তা মুনতাজুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫৮৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। গতবারের উৎপাদনের সমপরিমাণ ধরে এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছিলো ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির রপ্তানির সম্ভাবনা অনেক। তবে সম্ভাবনার তুলতায় সফলতা যে খুব যে বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রপ্তানি সংশ্লিষ্ঠ ব্যাক্তিবর্গ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বিভিন্নভাবে তাদের প্রচেষ্ঠা অব্যহত রেখেছেন। কিন্তু এদের সুনির্দিষ্ট কোন কর্ম পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। রপ্তানির বিষয়টি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হর্ট্রেক্স ফাউন্ডেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতি, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো যৌথভাবে সম্পন্ন করে থাকে। এদেশের বিভিন্ন ধরণের সবজি ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজির কিছু বৈশিষ্ট থাকা দরকার যা প্রচলিত চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ সমুহে ফল ও সবজি আমদানিতে যে মানদন্ড নির্ধারণ করেছে তা যথাযথভাবে না মানতে পারলে ঐ সমস্ত দেশ এদেশে হতে ফল ও সবজি আমদানি করবে না। বাংলাদেশ হতে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের সবজি বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। তবে ফলের রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা খুব বেশি দুর অগ্রসর হতে পারিনি। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, আমরা ক্রেতাদের শর্তসমুহ ঠিকমত ও যথাযথভাবে মানতে পারি না। এর সাথে রয়েছে আমাদের ভ্রান্ত ধারণাসমুহ। অনেকেই রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজি উৎপাদনের জন্য ফল ও সবজি চাষীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত অথচ তার জানা নেই রপ্তানির জন্য প্রধান অন্তরায়গুলো কি কি? কি ব্যবস্থা নিলে এগুলোকে দুর করা সম্ভব। বরং পাঠ্যপুস্তক থেকে যত বেশি নেগেটিভ কারণ সংযোজন করে তাদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েলটি পাকাপোক্ত করে থাকেন। এগুলো পড়লে বা দেখলে একজন সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে এদেশের ফল ও সবজিগুলো ভবিষৎতেও রপ্তানি করা সম্ভব নয়। এই ধারণা থেকে সংশ্লিষ্ট চাষীরা নিরুৎসাহিত হন। বরং বাস্তবভিত্তিক ধ্যান-ধারণা থেকে বাস্তবায়নযোগ্য ম্যানুয়েল তেরী করতে হবে যা চাষীদের জন্য সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

আমার মনে হয় রপ্তানি বিষয়টিকে ততটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করে আমরা বিভিন্ন ধরণের পরিকল্পনা গ্রহন করে থাকি। প্রত্যেকটি ফল ও সবজির একটি বৈশিষ্ট্য থাকবে, যা স্যানেটারী এবং ফাইটোস্যানেটরী মানদন্ড অনুসরণ করে উৎপাদন করতে হবে, সংগনিরোধ বালাইমুক্ত হতে হবে যেমন ফলের মাছি পোকা, থ্রিপস, সাদামাছি ইত্যাদি, উৎপাদন ও সংগ্রহ পর্যায়ে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ করতে হবে এবং ট্রেস্যাবিলিটির জন্য উৎপাদনের সকল পর্যায়ের তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হবে। এ সকল বিষয়গুলো সঠিকভাবে ও যথাযথ নিয়মে করতে হলে কন্ট্রাক্ট ফামিং বা চুক্তি ভিত্তিক ফসল চাষ এর বিকল্প নেই। আমরা আজকে জানবো আমের রপ্তানি ও কন্ট্রাক্ট ফামিং। আম রপ্তানি আম গবেষকদের কাছে অনেকটাই কঠিন কাজ ছিল তবে লক্ষ্য অর্জনে প্রচেষ্ঠাও ছিল। কিন্তু কখনও কাঙ্খিত শর্তসমুহ পুরণ করা সম্ভব হয়নি। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হতে হর্টেক্স ফাইন্ডেশনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জুন মাসে কিছু বারি আম-২ আম ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাঠানো হয়েছিল। আমগুলো পাওয়ার পর তা সাদরে গ্রহন করেছিল এবং জুলাইমাসে এক ফ্যাক্স বার্তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটকে জানানো হয় যে পাঠানো আমগুলো তাদের পছন্দ হয়েছে এবং বাংলাদেশের এই আমটি তারা নিতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে বারি আম-২ এর মৌসুম শেষ। আর মৌসুম থাকলেও বা কি ! এক টন আমের চাহিদা মেটাতে ১০ টনের মতো আম প্রয়োজন হতো। এরপর চলতে থাকে আরও গবেষণা। একবার কিছু কৃষি বিজ্ঞানিকে দক্ষ প্রশিক্ষক গড়ে তোলা হলো এবং ২০১৫ সালে তাদের মাধ্যমে আমচাষীদেরকে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। সকলে আশা ছিল এইবার হয়ত বেশকিছু আম বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। কিন্তু ঘটলো তার উল্টোটা । আম সুন্দর হওয়া তো দুরের কথা, অত্যধিক বৃষ্টির কারণে আমের রং ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এবং আমের মাছি পোকা দমন করা অনেকটাই কঠিন হয়েছিল। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে আমচাষীদের প্রশিক্ষিত করেও আম রপ্তানি সম্ভব হয়নি। সংশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ধারনাও ছিলনা অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে আমগুলো কিভাবে সুন্দুর থাকবে, আমের মাছি পোকা কিভাবে শতভাগ দমন করা যাবে। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, পরিকল্পনা যদি সঠিক না হয় তাহলে লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই কঠিন। অথচ ২০১৫ সালের আমের মৌসুমে ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ল্যাড়া ও ফজলি আম চাঁপাইনবাবগঞ্জ হতে বিদেশে রপ্তানি হয়। এরপরের মৌসুমে অর্থাৎ ২০১৬ সালে সারাদেশ হতে প্রায় ৩০০ টনের মতো আম ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানী, সুইডেন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীর প্রধান আম রপ্তানিকারক দেশে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় এই আমগুলো শতভাগ রপ্তানি উপযোগি। তাহলে আমরা কেন ব্যাগিং প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছি না। গবেষণার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রমানিত হয়েছে যে, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি একটি পরিবেশ বান্ধব, সাশ্রয়ী ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের সহজ উপায়। কন্ট্রান্ট ফামিং ধারনাটি যদিও রপ্তানিযোগ্য ফল ও সবজি উৎপাদনে একটি কার্যকরী ও ফলপ্রসু পদক্ষেপ তথাপিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কর্মতৎপরতা ততটা সন্তোষজনক নয়। আমি বুঝি না এটা কি তারা নিজেরাও ভালোভাবে বোঝেন কিনা। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিগত মৌসুমগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আমের ক্ষেত্রে কন্ট্রান্ট ফামিং নিয়ে কৃষকের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আসেন জানুয়ারী-ফেব্র“য়ারী মাসের দিকে। য়খন কিনা বাগান ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ন অংশসমুহ সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর এক শ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ শুধুই ভুল খুজে পান আমচাষীদের কিন্তু শোধরানোর কোন পথ তাদের জানা নায়। আসলে এই দোষ কি আমচাষীদের? কন্ট্রান্ট ফামিং এর ধারণা থেকে বুঝা যায়, ফল বা সবজি উৎপাদনের শুরু থেকে সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত চাষীদেরকে প্রথমেই ধারণা দেওয়া হবে। এরপর চাষীরা সে নিয়মনীতি গুলো সঠিকভাবে মেনে চলার চেষ্ঠা করবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উৎপাদনের বিভিন্ন সময় মনিটরিং করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এর উল্টোটা। আমরা বেশিরভাগ সময়েই মনিটরিং নিয়ে ব্যস্ত থাকি যেটি মোটেই কাম্য নয়। প্রথম বারের মতো কন্ট্রান্ট ফামিং এর মাধ্যমে উৎপাদিত আম বিদেশের বাজারে রপ্তানি করা হয়। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় শতভাগ ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত আম রপ্তানি হয়। প্রথমে রপ্তানিকারকদের চাহিদা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানো হয়, পরে চুক্তিভিত্তিক চাষীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট স্থানে আমগুলো নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান খেকে সর্টিং, গ্রেডিং শেষে মনোরম প্যাকেটে প্যাকিং করা হয়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেখো যায়, এদশের আমের কোন আধুনিক প্যাকিং হাউজ নেই। যে সকল জায়গায় বেশি পরিমানে গুনগত মানসম্পন্ন আম উৎপাদিত হয় সে সকল স্থানে প্যাকিং হাউজ নির্মান অত্যন্ত জরুরী মনে আমি মনে করি। আশাকরি, রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন যার ফলাফল আমরা আগমী মৌসুমে দেখতে পাবো। সুতরাং কন্ট্রান্ট ফার্মিং এর চাষীরা আম উৎপাদনের উত্তম ফসল ব্যবস্থাপনার (প্র“নিং, ট্রেনিং, সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনা) সাথে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে পারবেন।
একটি কথা মনে রাখতে হবে রপ্তানি একটি দেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়, কারও কোন অসাধু তৎপরতাই যেন এটি বন্ধ না হয় সেই বিষয়ে সকলকে আন্তরিক হতে হবে। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ পরিহার করে দেশের স্বার্থকে প্রধান্য দিতে হবে। তবেই আমাদের দেশের আম রপ্তানির ধারা অব্যহত থাকবে।


ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাই নবাবগঞ্জ

আম যে আমাদের ফলের রাজা এ নিয়ে বোধ করি কারও মতভেদ নেই। পাকা আমের কথা মনে হলেই কেমন জিভে পানি এসে যায়। কত রকমের আম যে আমাদের রয়েছে ভাবলে অবাক হতে হয়। দেশজুড়ে আমের জাত বৈচিত্র্য সত্যি সত্যি আমাদের বিস্মিত করে। আকার আকৃতি স্বাদে বর্ণে গন্ধে একেকটি আমের রয়েছে একেক রকম বিশিষ্টতা। পাকা আমের মৌসুমে সে এক আশ্চর্য মৌ মৌ করা গন্ধ চারপাশে। যত্রতত্র চোখে পড়ে নানা রকম পাকা আম। দুধ ভাতের সঙ্গে আমের রস মিশিয়ে দিয়ে সে যে এক ভুড়িভোজন তার কোন তুলনা হয় না। রসনা তৃপ্ত করে হাত ডুবিয়ে দুধে ভাতে রসে সে এক ভিন্ন রকম স্বাদ। আম যত মজাদার হয় এর স্বাদও তত বেড়ে যায়। আমের স্বাদের যে ভিন্নতা সেটি মূলত এর জাতের ওপর নির্ভরশীল। টক আর অতি মিষ্টি এবং এর মাঝখানে যত রকম স্বাদ রয়েছে সবই আমাদের আমের জাতগুলোতে রয়েছে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা হাজার হাজার বছর ধরে নানা রকম আমের জাত বাছাই করে নিয়েছে। বংশপরম্পরায় এসব জাত বাড়ির আশপাশে বা ক্ষেতে খামারের আইলে রোপণ করে দিয়ে এদের সংরক্ষণ করে আসছে। এদেশের গ্রামেগঞ্জে কত ভিন্ন রকম আমের দেখা মেলে। নানা রকম নাম দিয়ে এদের একটা জাতের গাছকে অন্য জাতের গাছের থেকে আলাদা করে চেনানোর চেষ্টা সেই ছোটবেলায়ই লক্ষ করেছি। মনে আছে একটি গাছের আম অনেক ছোট ছিল বলে গাছটার নাম দেয়া হয়েছিল ‘টরি’ আমের গাছ। আমের গাঁয়ে সিঁথির সিদুরের মতো রঙ ছিল যেসব গাছের এদের নাম দেয়া হয়েছিল ‘সিঁদুরে’ আমের গাছ। একটি লম্বা আম গাছে আমও ধরত লম্বা লম্বা বলে এই গাছটিকে বলা হতো ‘লম্বা’ আমের গাছ। হতে পারে অন্য কোন বাড়িতে এক জাতের আমকে অন্য জাত থেকে আলাদা করতে হয়তো অন্য কোন নাম দেয়া হতো। এসব কোন কেতাবি নাম নয়। মুখে মুখে বলা নাম। এদের অধিকাংশ জাত হিসেবে খুব প্রসিদ্ধও নয় যে এসব নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে যাবে। ভাবতে অবাক লাগে আমাদের পূর্ব পুরুষরা ১০-১২ হাজার দেশি জাতের ধানের প্রতিটিরই ভিন্ন ভিন্ন নাম দিলেও জনপ্রিয় ফল আমের ক্ষেত্রে প্রায়শই দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্থানীয় জাতের আমের সে রকম নামকরণ করা হয়নি। দিনে দিনে গ্রামেগঞ্জে আমের এই জাত বৈচিত্র্য এখন অবশ্য অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি সংগ্রহের কারণে এবং পতিত জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসায় অনেক গাছের মতো আম গাছের সংখ্যাও বহুলাংশে কমে এসেছে। তবে আমের অঙ্গজ বংশবিস্তার করার কৌশল রপ্ত করায় দেশের উত্তরাঞ্চলসহ অনেক স্থানেই মানুষ বাছাই করা জাতের আম চাষ শুরু করেছে অনেক দিন ধরেই। ফলে এখন স্থানীয় ভিন্ন রকম আমের তুলনায় বাছাই করা জাতের আম মৌসুমে বেশ পরিদৃষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশের জনপ্রিয় জাতের আমগুলোর কিন্তু সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে। এক নামে সারাদেশের মানুষ এদের চিনতে পারে। এসব জাতের একটা আলাদা কদর আর চাহিদা রয়েছে আমাদের কাছে। মৌসুমে এসব আম পেতে আমাদের ইচ্ছে করে। স্বাদে গন্ধে এসব জাতের কোন তুলনা হয় না। সে রকম জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ল্যাংড়া, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ, মোহনভোগ, ক্ষীরপুলি, শাহী-পছন্দ, রাজভোগ, মির্জাপুরী, কিষাণভোগ, ফজলি, চসা, আশ্বিনা, খিরসা পাতি, হিমসাগর, অমৃতভোগ, রানী পছন্দ, কৃষ্ণভোগ, দিল পছন্দ, বোম্বাই (মালদা), সূর্যপুরী, মিসরীভোগ, শ্রীধন, গোলাপ খাস, বৃন্দাবনী, দিল খোশ, হাড়ি ভাংগা, কোহিতুর ইত্যাদি। বাংলাদেশে জন্মায় তেমন কিছু উৎকৃষ্ট জাতের মধ্যে রয়েছে লক্ষণভোগ, মোহনভোগ, ক্ষীরপুলি, শাহী-পছন্দ, রাজভোগ, মির্জাপুরী, অমৃতভোগ, রানী পছন্দ, কৃষ্ণভোগ, দিল পছন্দ, বৃন্দাবনী, দিল খোশ, হাড়ি ভাংগা, কোহিতুর ইত্যাদি। এদেশে আবাদ করা হচ্ছে তেমন অন্য জাতগুলো হল আশ্বিনা, বারমাসী ও কাঁচা মিঠা। আমের জাতের কিছু মনোহরা নামও আছে। কোহিনুর, চৈতালী, জাফরান, দিল খোস, দুধ কুমার, দুধসর, বাবুই ঝাঁকি, মধুচাকী, মিঠুয়া, শ্রাবণী, স্বর্ণরেখা, সুবর্ণরেখা, ক্ষীরপুলি ইত্যাদি। এদের কোন কোনটা দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রধান আম হল ফজলি। সব জাতের আম যখন শেষ হয়ে যায় তখন বাজারে আসে আঁশহীন, অতি সুস্বাদু এই জাতের বৃহদাকৃতির আম। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত হল ল্যাংড়া। সুগন্ধী, অতি সুমিষ্ট, আঁশহীন এই জাতটি আবার আগাম। মিষ্ট শাঁসযুক্ত সুস্বাদু আঁশহীন আর একটি প্রিয় জাতের আম হল গোপালভোগ। হিমসাগরও এদেশের আর একটি উৎকৃষ্ট জাত। এদের ফল রসাল, মিষ্টি ও আঁশবিহীন। কিষাণভোগ জাতটির শাঁস সুমিষ্ট ও সুগন্ধীযুক্ত। আশ্বিনা আম জাতটি দেখতে অনেকটা ফজলির মতো। গুণেমানে এটি ফজলির চেয়ে নি¤œমানের। এই আমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে নাবি জাত। অন্য আম যখন থাকে না তখন স্বাভাবিকভাবেই এর কদর কিছুটা বাড়ে। ‘বারমাসী’ নামে আমের যে জাতটি রয়েছে এটিতে বছরে দুই-তিন বার আম ফলে। মোটামুটি সুস্বাদু এর আম। কাঁচা মিঠা জাতের আম কাঁচা অবস্থায়ই মিষ্টি বলে এ রকম নাম পেয়েছে। তবে পাকলেও মন্দ নয় এসব আম। আমের জাতের মধ্যে বেশ ছোট জাতের আম যেমন রয়েছে তেমনি বিশালাকৃতির কেজি ছুঁই ছুঁই বা কেজি ছাড়িয়ে যাওয়া আমও রয়েছে। অধিকাংশ স্থানীয় গুটি আমগুলো আসলে ছোট জাতের আম। এরা খুব একটা মাংসল নয়। এদের বীজটা ফলের বড় অংশ দখল করে নেয় বলে এসব জাতের আম খুব একটা লোভনীয় নয়। তবে এসব আম সহজেই মুখের ভেতর পুরে দেয়া সম্ভব হয়। তবে উন্নত জাতের জনপ্রিয় আমের অনেকগুলোর ফলও কিন্তু তুলনামূলকভাবে ছোটই বলা চলে। এসব জাতের আমের মধ্যে রয়েছে- ল্যাংড়া, খিরসা পাতি, বৃন্দাবনী, দুধিয়া, মিঠুয়া ইত্যাদি। মাঝারি আকৃতির জনপ্রিয় আমের জাতই আমাদের বেশি। গোপালভোগ, কিষাণভোগ, হিম সাগর, কোহিতুর, মোহনভোগ, মিসরীভোগ, বোম্বাই এসব হল মাঝারি ধরনের আম জাত। বড় আকৃতির আমের মধ্যে ফজলি অন্যতম। এর আরেক নাম মালদা। এটি বাংলাদেশে একটি অতি জনপ্রিয় জাতের একটি। মাঝারি থেকে বড় আকারের আমের মধ্যে রয়েছে হাড়ি ভাংগা, মোহনভোগ, মিসরীভোগ এসব আম। হাড়ি ভাংগা আমগুলো ফজলি আমের মতো লম্বাটে নয়। বরং এরা বেশ খানিকটা গোলাকৃতি ধরনের। বড় বেশি মাংস এদের বীজের চার পাশে। খুবই আশু জাতীয় আম হল দুধিয়া। এটি মে মাসেই পেকে যায়। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে যেসব আম আসে সেসব জাত হল গোপালভোগ, মহানন্দা, খিরসা পাতি, কোহিতুর, বৃন্দাবনী, মিঠুয়া। এসব আম মৌসুমের শুরুতেই জুন মাসে পাকে বলে এদের আশু জাত বলা হয়। মাঝারি মৌসুমের জাতগুলো হল কিষাণভোগ, ল্যাংড়া, হিমসাগর, বোম্বাই, মোহনভোগ, মিসরীভোগ। এরা মধ্য জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে পাকে। আমের মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসে ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, শ্রীধন এসব জাতের আম। মধ্য জুলাই থেকে আগস্ট সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এরা পাকে। ফজলি, চসা, ল্যাংড়া কিংবা হিমসাগর আমাদের দেশের মতো ভারতেও বেশ জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিক আম জাত। ভারতের কেবল পশ্চিমবঙ্গে এদের পাওয়া যায় তা কিন্তু নয় বরং পশ্চিম বাংলাসহ আরও ১১টি রাজ্যে এদের কোন কোনটা অত্যন্ত জনপ্রিয় জাত। ফজলি আম বিহার, হরিয়ানা, মধ্য প্রদেশ ও পশ্চিম বাংলায় আবাদ করা জাত। চসা জাতটি বিহার, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং উত্তর প্রদেশের একটি বাণিজ্যিক জাত। হিমসাগর জাতটির আবাদ করা হয় বিহার ও পশ্চিম বঙ্গে। আম্রপালী জাতটি দিন দিন আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি ভারতের একটি জনপ্রিয় জাত। ভারতের বিহার এবং উত্তর প্রদেশে এই জাতটির আবাদ করা হয়। এটি আসলে আম প্রজনন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উদ্ভাবিত একটি জাত। ‘দেশারী’ আর ‘নিলাম’ নামক দুটি ভারতীয় জাতের মধ্যে পরাগ সংযোগ ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে আম্রপালী জাতটি। ছোট খাটো আম্রপালী গাছে লম্বা বোঁটায় ঝুলে থাকে অনেকগুলো আম। প্রতি বছরই এ জাতের গাছে ফুল ফোটে বলে সব মৌসুমেই আম পাওয়া যায়। গাছের আকার আকৃতি ছোট বলে নির্ধারিত স্থানে অনেক বেশি সংখ্যক গাছ লাগানো যায়। পাকা আমের আকৃতি মাঝারি, মাংস গাঢ় কমলাবর্ণ, বেশ মিষ্টি আর আঁশবিহীন। আমাদের দেশেও কিন্তু শুরু হয়েছে নতুন জাত সৃষ্টির কর্মকাণ্ড। যদিও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আম গবেষণা কেন্দ্রে এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলের জার্মপ্লাজম কেন্দ্রে দেশ বিদেশ থেকে সংগৃহীত জাত থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা উত্তম আমের জেনোটাইপকে নতুন জাত হিসেবে অবমুক্ত করার রেওয়াজ এখনও চলছে, তবু এখন আম গবেষণা কেন্দ্রে ক্রস ব্রিডিং পদ্ধতিতে আম উন্নয়নের কাজও চলছে। আমের ক্রস ব্রিডিংয়ের উদ্দেশ্য হল নিয়মিত প্রতি বছর এবং ছোট খাটো প্রকৃতির গাছেই যেন আম ধরে সে রকম জাত উদ্ভাবন। খর্বাকৃতি আম গাছ, মাংসের পরিমাণ অধিক, মাংস আঁশবিহীন, বড় ফল এবং মাংস লাল, আমের সংরক্ষণ মান ভালো এমনি কত রকম লক্ষ নিয়ে চলে আমের জাত উদ্ভাবনের কাজ। অনেক আমের মঞ্জুরি ব্যবহার করে ক্রস ব্রিডিং করতে হয়। তবে প্রতি মঞ্জুরির অল্প কয়েকটি ফুলে ক্রসিং সম্পন্ন করলে কৃতকার্য হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আম গবেষণা কেন্দ্র বারি আম ৪ নামক একটি জাত দুইটি জাতের মধ্যে ক্রসের মাধ্যমে উদ্ভাবন করেছে। আরও জাত তৈরির কর্মকাণ্ড সেখানে চলছে। আমের চারা লাগানোর তিন চার বছর পর কলমের চারা থেকে পাওয়া গাছে প্রথম ফল ধরে। অথচ কোন একটি জাত সত্যি সত্যি উত্তম জাত কিনা ফল ধরার আগেই এটি আম চাষির জানতে ইচ্ছে করে। আম প্রজননের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের জন্যতো এটি জানা একটি আবশ্যিক বিষয়। বিজ্ঞানীরা অবশ্য নানা রকম গবেষণা থেকে গাছে আম ধরার আগেই কিছু বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আম জাতের উৎকৃষ্টতা যাচাই করার কিছু কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এসব কৌশল হল যে আম জাতের পাতার গন্ধ উত্তম এর ফলের গন্ধও সুমিষ্ট হয়। যে জাতের আম গাছে ফল ধারণ অবস্থায়ই বা আম সংগ্রহের শেষেই প্রতি বছর নতুন করে পাতা গজায় সে জাত প্রতি বছরই ফল দিতে সক্ষম। পাতার প্রতি একক ক্ষেত্রে নিম্ন সংখ্যক পত্ররন্ধ্র গাছটির খর্বাকৃতির হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ করে। আম গাছের শীর্ষ কুঁড়িতে অধিক ফেনোলিকের উপস্থিতি আম গাছের কম তেজ এবং গাছটির খর্বাকৃতির হওয়ার আর একটি লক্ষণ। ভারতে এক হাজারের মতো আমের জাত রয়েছে। আমাদেরও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভালো মন্দ অনেক জাত রয়েছে। দেশের নানা অঞ্চল থেকে এসব জাত সংগ্রহ করার পাশাপাশি ভারতের আম জাত প্রবর্তন করে শুধু বাছাই করেই এখনও অনেক আম জাত উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে। মানুষের ভিন্নতর চাহিদার বিষয়টিকে মাথায় রেখে আমাদের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজও চলবে। চলবে বিদ্যমান বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতগুলোর সংরক্ষণের মাধ্যমে আমের জাত উন্নয়নের কাজও। সে কাজ আসলে এখন চলছেও আম গবেষণা কেন্দ্রে। আমাদের বিজ্ঞানীরা আমাদের রুচি আর চাহিদার খবরটিও রাখেন। সেই নিরিখেই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা গবেষণা কর্মকাণ্ড।

 

বিলেত গেলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফ্রুট ব্যাগিং আম
ছবি-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিকভাবে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত আম যুক্তরাজ্যে রফতানি শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার (০৭ জুন) তিন টন আমের একটি চালান যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে পাঠানো হয়।

এর মধ্য দিয়ে ফ্রুট ব্যাগিং আম রফতানির নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুললো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ উপলক্ষে দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে (আম গবেষণা কেন্দ্র) এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

আম গবেষণা কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামিম রেজার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাজদার রহমান। সার্বিক সহযোগিতা করেন কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন।

সভায় আম বিজ্ঞানীরা বলেন, কেন্দ্রে গত দুই বছরের গবেষণায় ১৮ জাতের আমে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এবার আম চাষিদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আম চাষে এ পদ্ধতি অনেক সাশ্রয়ী।

বক্তারা বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে শতভাগ রোগ ও পোকা-মাকড়মুক্ত আম উৎপাদন সম্ভব। এসব আম সংগ্রহের পর ১০-১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে।

তারা বলেন, এ প্রযুক্তি সব আম চাষিদের কাছে পৌঁছানো গেলে ক্ষতিকারক রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হবে।

 

বাঁধা সময়ই কাল হতে যাচ্ছে আম ব্যবসায়ীদের

 প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এবার ২৫ মে’র আগে গাছ থেকে আম ভাঙতে পারেননি রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা। আমে ফরমালিন ঠেকাতে মৌসুম শুরুর আগেই ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

কিন্তু বেঁধে দেওয়া সময়ের নিষেধাজ্ঞা শেষে এখন সব গাছের আম এক সঙ্গে পাকতে শুরু করেছে। বাধ্য হয়েই গাছ থেকে পাকা আম নামিয়ে ফেলতে হচ্ছে চাষিদের। ফলে চলতি সপ্তাহে বাজারে আমের যোগান বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় এখনও ঢাকা বা অন্য স্থান থেকে পাইকাররা আসছেন না।

তাই আমের মোকামে এখন পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই। এর উপর চলতি সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এতে ভরা মৌসুমের বেচা-কেনায় ধস নামার আশঙ্কা করছেন এই অঞ্চলের আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। বাজার মন্দা হলে এ মৌসুমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে বলে দাবি তাদের।

এই অবস্থায় জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ জুন বুধবার থেকে ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর ও লক্ষ্মণভোগ আম ভাঙ্গা হচ্ছে গাছ থেকে। ১০ জুন নামানোর কথা রয়েছে ল্যাংড়া ও বোম্বাই, ২৫ জুন ফজলি, ১ জুলাই আম্রপালি এবং ১৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা আম নামানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। বাজার তদারকির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বর্তমানে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মণিগ্রাম এলাকার সফল আম চাষি ও ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান জানান, বেঁধে দেওয়া সময় নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল তাদের। কারণ আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে এই অঞ্চলে সময়ের আগেই গাছে আম পেকে যায়। এ অবস্থায় কয়েক দিনের ব্যবধানে এক সাথে আম ভাঙ্গার নির্দেশনা দিলে পাকা আম নিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু কেউ তাদের কথা শোনেননি। ফলে যা হওয়ার তাই হতে যাচ্ছে এবার।

বছরজুড়ে পরিশ্রম ও বিনিয়োগের ফল সুষ্ঠুভাবে ঘরে তুলতে পারলেই মুখ ফুটতো কৃষকের। কিন্তু মোকামে পাইকাররা এখন পর্যন্ত সেভাবে না আসায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া সঠিক দাম ও বাজারজাত করা নিয়েও দুশ্চিন্তা ভর করেছে ব্যবসায়ীদের মনে, জানান জিল্লুর।

তার অভিযোগ, এ অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল আম নিয়ে দু’বছর থেকে বহুমুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফরমালিনের ধুয়া ‍তুলে আম নিয়ে বিরূপ প্রচারণাও হয়েছে। ফলে বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। তাই কৃষকদের বাঁচাতে এখন সরকারের উচিত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া।

তবে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দীন জানান, রাসায়নিকমুক্ত আমের বাজারজাত নিশ্চিতে তারা খুবই সচেতন। গাছ থেকে অপরিপক্ক আম নামিয়ে রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বাজারে ওঠা ঠেকাতেই এবার জেলার প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট ইউএনও এবং এসি (ল্যান্ড) এর সমন্বয়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়। এখন তারা সেই বিষয়গুলো দেখছেন।

পুরো মৌসুম জুড়ে তাদের মনিটরিং থাকবে বলেও জানান তিনি।

সংশয় বা আতঙ্ক কেটে গেছে। এবারও আমে ফরমালিন নেই। বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অএন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) এর পরীক্ষায় বাজারে আসা আমে ফরমালিন পাওয়া যায়নি। গতকাল শনিবার ঢাকার কয়েকটি বাজারে অভিযান চালিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষায় আমে ফরমালিন পাওয়া যায়নি বলে জানান বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য সুখবর। বিশেষ করে যারা বিষাক্ত রাসায়নিকের ভয়ে মৌসুমী ফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন তাদের জন্য খুবই ভালো খবর এটি। ভেজালবিরোধী অভিযানের এক সময়ের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আল-আমীন এ প্রসঙ্গে ইনকিলাবকে বলেন, এখন কৃষক থেকে শুরু করে পাইকারী-খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতা সবাই সচেতন। নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে কেউই আর ফলে ফরমালিন দেয়ার পক্ষে নন। এটাকে ভেজালবিরোধী অভিযানের সুফল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবেই একদিন সবকিছুই ভেজালমুক্ত হবে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ফলের বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এবার ভরা মৌসুমেও ফরমালিন মিশ্রিত আম আসছে না। এমনকি পুরান ঢাকার পাইকারী আড়তেও ফরমালিন দেয়ার প্রবণতা নেই। বাদামতলীর পাইকারী ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিন জানান, আগে র‌্যাব-পুলিশের কঠোর নজরদারির মধ্যেও ফরমালিন মেশানো ঠেকানো যেতো না। এখন খুব একটা নজরদারি নেই। তারপরেও কেউই ফরমালিন মেশাচ্ছে বলে তাঁর জানা নেই। আরেক পাইকারী ব্যবসায়ী রুহুল আমিন বলেন, আমরা সচেতন হয়েছি। কেউ আমে বা মৌসুমী অন্য কোনো ফলে ফরমালিন বা কার্বাইড দিচ্ছে এমন খবর শুনলেই মার্কেটের ব্যবসায়ীরাই মিলে প্রতিবাদ করে, বাধা দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম আম উৎপাদন কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আম পাড়ার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। একটা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ব্যবসায়ীরা যাতে গাছ থেকে আম না পারেন সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাগানগুলোতে গত ২৫ মে পর্যন্ত আম পাড়া নিষেধ ছিল। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার আম চাষী মোবারক হোসেন টেলিফোনে বলেন, ফুল আসার পর কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষার জন্য আম গাছে কিছু ওষুধ দেয়া হয়। কীট মরে গেলে আর কোনো প্রকার ওষুধ ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলেন, আগে বাগানেই ফরমালিন বা কার্বাইড ব্যবহার করা হতো একথা সত্য। এখন তা হয় না। প্রশাসন এখন অনেক কঠোর। আমে মুকুল আসার পর থেকেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়। র‌্যাবও মনিটরিং করছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন সব সময় খোঁজ খবর নিয়েছে। এর মধ্যে ফরমালিন মেশানোর সুযোগ নাই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেক পাইকারী ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, এখন উৎপাদক থেকে শুরু করে ক্রেতা পর্যন্ত সবাই সতর্ক। কেউই চায় না আমে বিষাক্ত ফরমালিন মেশাতে। এই সচেতনতাই আমকে ‘বিষমুক্ত’ করেছে। ঢাকার কয়েকজন ফল ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের আগেই ভারতীয় আম বাজারে আসে। সে সব আমে ফরমালিন মিশ্রিত থাকে। ফরমালিনের বদনামটা আসে ভারত থেকে আমদানিকৃত আম থেকেই। যাত্রাবাড়ীর ফল বিক্রেতা সায়মন বলেন, ভারত থেকে আনা আমগুলো অনেক দিন বাজারে রাখতে হয় বলে সেগুলোতে ফরমালিন মেশানো থাকে। বাজারে প্রথম আসার কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ থাকে বেশি। দামও থাকে অনেক বেশি। বেশি দাম দিয়ে ক্রেতারা ফরমালিনযুক্ত আমগুলো কেনার পর সেগুলো কেনার পর ‘বদনাম’ হয় দেশী আমের। মীরহাজিরবাগের ব্যবসায়ী আলম বলেন, দেশী আমে ফরমালিন দেয়ার প্রয়োজন হয় না। দেশী আম মোটামুটি ‘পোক্ত’ হলেই বাজারে আসে। ওই আম পাকতেও দেরি হয়। বিক্রিতে সময় পাওয়া যায়। একটানা ১০/১৫দিন রাখলেও ঝুড়ির আম পচে না। গত কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে আমের রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাংবাদিকদের জানান, বাজারের আমে কোনো প্রকার রাসায়নিক পদার্থ বা ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যায় নি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওই টিম অভিযানকালে আম, আপেল, আঙ্গুর এবং মাল্টার ২০টি নমুনা সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই)। এসব নমুনা পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এবার মৌসুমের আগে থেকেই ফলে ফরমালিন ও কার্বাইড ব্যবহারের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সুফল এটি। আতঙ্কে মৌসুমী ফল খাওয়া ছেড়ে দেয়া মানুষের জন্য এটি অনেক বড় সুখবর। এ প্রসঙ্গে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, সারাদেশে বিএসটিআইয়ের ৬টি অফিসের মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান ও মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে ফলে ফরমালিন দেয়ার প্রবণতা কমেছে। তবে বিএসটিআইয়ের এই কর্মকর্তা মনে করেন, অভিযানের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে যে সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে সেটা অনেকটাই ফলপ্রসূ হয়েছে।

পাকা আমের মধুর রসে মন হারাতে চায় সবার। আবার স্বাদের ভুবনে ভিন্নতাও খোঁজে। এদিকে রসে ভরপুর আমের পুষ্টিগুণ শরীরকে রাখে নানা রোগব্যধি থেকে মুক্ত। রসে ভরা টুসটুসে আমের স্বাদ যতই নিন না কেন, তার প্রতি আগ্রহ কমে না কিছুতেই।

 

বাড়ির ছোট্ট সোনামনিও আম বা আমের জুস খেতে খুবই পছন্দ করে। তাই অনেক বার চেষ্টা করেছেন ফ্রিজে আম সংরক্ষণের, সেখানে হয়েছেন ব্যর্থ। আস্ত আম রেখে কিছুদিন যেতে না যেতেই খাবারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সব আম।

এছাড়া পচনশীল হওয়ায় ফ্রিজের বাইরে আম সংরক্ষণের কথা তো ভাবায় যায় না। বাজারে বতলজাত যে আমের জুস পাওয়া যায় তার অধিকাংশই কেমিক্যালযুক্ত ফ্লেভার মাত্র, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাহলে সারা বছর পাকা আমের আসল স্বাদ নেয়ার উপায় কি? আছে, সামান্য কৌশলেই সারাবছর পেতে পারেন পাকা আমের স্বাদ। আসুন শিখে নেয়া যাক।

* প্রথমে যে পাকা আমগুলো সংরক্ষণ করবেন তা বাছাই করুন।
* এবার ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিন।
* বড় একটি পরিষ্কার গামলায় রেখে খোসা ছাড়ানো আম আটি ছাড়িয়ে জুস করে নিতে হবে।
* আমের জুস থেকে আটি আলাদা করে পছন্দের বক্স ভরে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন।
* ছোট ছোট পাত্রে এমন পরিমাণ আমের জুস রাখতে হবে যা বের করে একবারে খাওয়া যায়। তাহলে আপনার জন্যই সুবিধা হবে।
* এবার সারা বছর থাকুন নিশ্চিন্তে। স্বাদের কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়াই সারা বছর পাকা আম খান।

যখনই আম খেতে মন চাইবে তখনই বের করে নিন এক বক্স আম। এবার তা ব্লেন্ডার ব্লেন্ড করে জুস বা মিল্ক শেক তৈরি করে খেতে পারেন।

6

টেকনাফ উপজেলার প্রতিটি এলাকায় আমের বা¤পার ফলন হয়েছে। এতে সাধারণ মানষের মুখে হাসি ফুটেছে। কারণ টেকনাফের আম রপ্তানি হচ্ছে এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এখানকার মানুষ আর আম পাকার অপেক্ষায় থাকছে না। বাজারে কাঁচা আমের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা সব আম পেড়ে নিয়ে আসছে বাজারে। প্রতি কেজি কাঁচা আম বিক্রি করে পাচ্ছে কমপক্ষে ৭০-৮০ টাকা। আমের সাইজ বড় ও দেখতে সুন্দর হলে কেজি ১০০ টাকার উপরে। মওসুমের শুরুতে ছিল প্রতি কেজি ২৫০-৩০০ টাকা। পাইকারি আম ব্যবসায়ীরা গ্রামের আম কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে সংগ্রহ করে ট্রাকভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কাঁচা আম রপ্তানি করে আয় করছে লক্ষ লক্ষ টাকা। আমের মৌসুম এলে দেশের বিভিন্ন স্থানে টেকনাফের কাঁচা আমের চাহিদা বেশি থাকে। টেকনাফের আমের বাম্পার ফলন হলেও এ অঞ্চলের মানুষ পাকা আমের মধুর রসে মুখ রাঙাতে পারবে না। টেকনাফের মানুষ নিজেরা এ কাঁচাআমের স্বাদ না নিলেও দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষেরা স্বাদ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। প্রতিদিন টেকনাফ থেকে ৫-৬ ট্রাক কাঁচা আম চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। যার বাজার দর ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মতো। আমচাষি সৈয়দ আকবর বলেন, প্রতিবছর টেকনাফে আমের আগাম ফলন হয় এবং খেতেও সু-স্বাদু। পাশাপাশি টেকনাফের কাঁচা আমের চাহিদা বেশি থাকে আচার তৈরিকারীদের মাঝে। এতে এখানকার আমের চাহিদা ও কদর দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।

 

আম রফতানির মাধ্যমে চাষিদের মুনাফা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এজন্য দেশে বাণিজ্যিকভাবে আমের উৎপাদন, কেমিক্যালমুক্ত পরিচর্যা এবং রফতানি বাড়াতে সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে গাছে মুকুল আসা থেকে শুরু করে ফল পরিপক্বতা অর্জন, আহরণ, গুদামজাত, পরিবহন এবং সারাদেশে বাজারজাতের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত আম রফতানি কার্যক্রমেও নিবিড় তদারকিতে থাকবে সরকারের। মূলত ভোক্তার সুরক্ষা নিশ্চিত, রফতানি মান ধরে রাখা এবং চাষীর মুনাফা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য মৌসুম চলাকালীন সারাদেশে আমবাগানগুলো স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারিতে রাখা হবে। তবে বাগান করবেন চাষীরাই। এর মালিকানায়ও থাকবেন তারা। তবে বাগানে গাছ ও মুকুলের সুষ্ঠু পরিচর্যা, সর্বোত্তম ফলন এবং বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগ প্রতিরোধেই এই সময়ে বাগানগুলো স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা তদারকি করবেন। একই সাথে বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগ ঠেকাতে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে উদ্যোগী হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নিয়ে এই ব্যাপারে একটি গাইডলাইন জারি করেছে। তাতে বলা হয়- কোনো অবস্থাতেই আমের মুকুলে বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগ করা যাবে না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজন হলে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে মানবদেহে সহনীয় মাত্রার ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে। সেক্ষেত্রে তা প্রয়োগের কমপক্ষে সাত দিনের মধ্যে ফলন খাওয়ার জন্য বাজারজাত করা যাবে না। নির্দেশনায় একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ে পরিপক্ব না হওয়া পর্যন্ত গাছ থেকে চাইলেই আম আহরণ করা যাবে না। বাগান পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের এসব তদারকি নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসক, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় কৃষি অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় যৌথ সভা করেছে। ওসব সভার মাধ্যমেই প্রত্যন্ত এলাকার আমচাষীদের কাছে এই সব বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। একই সাথে চাষীদের এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভালো ফলন পাওয়ার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। বর্তমানে এদেশে বার্ষিক উৎপাদিত আমের পরিমাণ ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯৩০ টন। আর দেশে উৎপাদিত আমের চাহিদা মেটানোর পরও ৭০ শতাংশ উদ্বৃত্ত আম রফতানির সুযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব আম রফতানি করে খুব সহজেই ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডের মতো আম রফতানিকারক দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা করতে পারবে। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত প্যাকিং ও বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে রফতানির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও সম্ভব। কিন্তু বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও নানা সমস্যার কারণে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র আরো জানায়, গতবছর পরীক্ষামূলকভাবে রফতানি করার পর ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আম নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত চেইন শপ ওয়ালমার্ট এবছরও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আম আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারের তারা উচ্চপর্যায়েও বিষয়টি জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এই আগ্রহ এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের আমবাগানগুলো পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারণ জাতীয় অর্থনীতিতে ফলের অবদান কম নয়। তবে ফলের আওতায় মোট আবাদি-চাষভুক্ত জমির পরিমাণ ১.৬৬ ভাগ। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের প্রায় ১০ ভাগই আসে ফল থেকে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুসারে রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে সুস্বাদু ও রসালো আমকে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দেশের সীমিতসংখ্যক বাগানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম উৎপাদন হলেও এই উৎপাদিত আমই চাহিদা পূরণ কওে দেশের বাইরে স্বল্প পরিসরে রফতানি হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইনে চাষীরা পরিচালিত হলে এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি থাকলে তাতে সবদিক থেকেই লাভবান হওয়া সম্ভব। আর তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে সারাদেশে আমবাগানগুলোর তদারকি কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও চলতি মাসের প্রথম দিকে সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলকার আমবাগান পরিদর্শন করেছে। মৌসুমের বাকি সময়েও আমের জন্য প্রসিদ্ধ জেলাগুলোর আমবাগান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

মীর মোস্তফা আলী: ঋতুরাজ বসস্তের সাথে সাথে উপকুলীয় জেলা সাতক্ষীরায় আমের মুকুলেই জানান দিচ্ছে মধুমাসের আগমনী বার্তা। সোনালি-হলুদের মিশ্রণে মৌ মৌ গন্ধে মুকুলের পাগল করা ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। যে গন্ধ মানুষের মন ও প্রাণকে বিমোহিত করে। শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্র আম গাছগুলো তার মুকুল নিয়ে হলদে রঙ ধারণ করে সেঁজেছে এক অপরূপ সাঁজে। যে কারণে সুবাসিত হয়ে উঠেছে পুরো জেলা। বর্তমানে আমের নাম বলতেই আসে সাতক্ষীরার নাম। মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে সাতক্ষীরার উৎপাদিত আম অনেক সুস্বাদু হওয়ায় এবং অন্যসব জেলার আগে এ জেলার আম পাকায় এর কদর দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারেও বেড়েছে চাহিদা। সাতক্ষীরায় বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়ে তাকে তার মধ্যে হিমসাগর, ন্যাংড়া, গেবিন্দভোগ, আ¤্রপলি, মল্লিকা, সিদুর রাঙ্গা, ফজলি, কাচামিঠা, বোম্বায়, লতাআম বেশি চাষ করা হয়।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার মানুষ ধানের জমি ও বরেন্দ্র এলাকায় জমি কিনে বানাচ্ছেন আমবাগান এবং গড়ে উঠেছে হাজার হাজার আম বাগান। ফলে দিনে দিনে এ অঞ্চলে আম চাষে নীরব বিপ্লব ঘটছে। শ্রমিক দিয়ে সারা বছর পরিচর্যা করছেন বাগানের। এতে বহু বেকার লোকের কর্মসংস্থান ঘটেছে। হিমসাগর আর ন্যাংরা আমের রাজধানী সাতক্ষীরার মানুষ বহুকাল ধরেই আম চাষে জড়িত। দেশের জন্য আম একটি মৌসুমি ফল হলেও সাতক্ষীরা জেলা এটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিণত হয়েছে।
এ খাতে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে আম কেনাবেচা পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে থাকে সাতক্ষীরা অঞ্চলে। এদিকে গাছে গাছে মুকুলের সমারোহে আমবাগান হাতবদল হতে শুরু করেছে। আমের মুকুল বেশি হওয়ায় এবার বেশি দামে বাগান বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের আমের ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় বাগান কিনতে শুরু করেছে।
সাতক্ষীরার আম বিদেশে চাহিদা বাড়াই গতবারের চেয়ে এবার ব্যবসায়ীরা বেশি আসছেন। সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ীরা জানান, মুকুলের ওপর ভিত্তি করেই বাগান কেনাবেচা হয়ে থাকে। এজন্য আমগাছ পরিচর্যার সাথে সাথে মুকুল রক্ষায় বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারে ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষীরা। এবার আমের মুকুল বেশি হওয়ায় বাগানের দামও বেশি।
এবছর সদর উপজেলা কৃষিবিভাগের মাধ্যমে ১০০ হেক্টর জমিতে ৬০টি আম বাগানের ২০জন মালিককের ২১ হাজার আমগাছকে অধিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিষমুক্ত হিমসাগর, ন্যাংড়া ও মল্লিকা আম প্রস্তুত করা হচ্ছে যুক্তরাজ্যের জন্য।
এছাড়া ইউএসএআইভি জেলার ৫০০ বেশি আম চাষিকে বিদেশে বাজার যাত করনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। গতবছর এ জেলা থেকে ২৩ টন আম যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি হলেও এবার ১৫০টন আম রপ্তানি করা হবে বলে মনে করেন সদর উপজেলা কৃষিবিভাগ। এজন্য হটএক্্র ফাউন্ডেশন প্রতিনিধি দলেরর সাথে সাতক্ষীরার আম বাগান পরিদর্শন করেন এফএও ফুড সেল প্রগ্রামঅফিসার বিদেশি নগরিক ম্যাক ডিলন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার আমের আবাদ করা হয়েছে ৩৮২৫ হেক্টর জমিতে। যা গতবারের তুলনায় ২০৪ হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ করা হয়েছে। আর আম উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। যা গতবারের চেয়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি।
মৌসুমের শুরুতেই সরেজমিনে বিভিন্ন আম বাগান ঘুরে দেখা গেছে, আম গাছে শোভা পাচ্ছে কেবলই মুকুল। এ যেন হলুদ আর সবুজের মহামিলন। মুকুলে মুকুলে ছেয়ে আছে গাছের প্রতিটি ডালপালা। চারদিকে ছড়াচ্ছে সেই মুকুলের সুবাসিত পাগল করা ঘ্রাণ। তবে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন এই জেলার আম চাষিরা। এই আমচাষে সাধারনত ব্যাক্তি মালিকানার পাশাপাশি লিজ নিয়ে আমচাষ করে জীবীকা নির্বাহ করেন অনেকে।
আম চাষিদের দাবি সরকার যদি আম পাড়া বা সংরক্ষণের উপর বিশেষ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে তাহলে আমাদের আমে দাগ হবে না। ডিমের খাচিরমত বিশেষ কায়দায় আম বাজার যাত করা গেলে ব্যবসায়িরা লাভবান হবে বিদেশেও এর চাহিদা আরো বাড়বে

Page 5 of 18